বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফটকের মুখেই দাঁড়িয়ে গল্প করছিল দশম শ্রেণির দুই ছাত্রী নুসরাত জাহান ও তাসফিয়া তাসনীম। এত দিন পর কেমন লাগছে স্কুলে এসে, এমন প্রশ্নের জবাবে নুসরাত বলল, ‘জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাসায় প্যাড়ার কোনো শেষ নেই। খালি বলে, পড় পড়। মোবাইল হাতে নিলে বলে, মোবাইলই শেষ করল। ক্লাস তো মোবাইলে।’ বলেই হেসে কুটি কুটি নুসরাত। নুসরাত ও তাসফিয়া—দুজনই খুশি এত দিন পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পেরে।

default-image

কাছেই সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ে লাবিবা তাবাসসুমকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা। যাত্রাবাড়ী থেকে সিএনজিতে চেপে সকাল সাড়ে ছয়টায় রওনা দিয়েছেন। আধা ঘণ্টার ভেতরেই পৌঁছে গেছেন স্কুলে। ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ক্লাস হবে প্রথম দিনে। আবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়েই বাসায় ফিরবেন বলে তিনি জানালেন। এই বাবা প্রথম আলোকে বললেন, আগে মেয়েকে সকালে ঘুম থেকে ওঠাতে বেশ বেগ পেতে হতো। আজ হয়নি। তাঁরা জেগে ওঠার আগেই দেখেন, মেয়ে স্কুলের পোশাক পরে বসে আছে। সবকিছু আজ ঝটপট সেরেছে সে।

তবে একেবারেই শঙ্কা নেই কারও মধ্যে, তা নয়। মেরুল বাড্ডা থেকে মরিয়ম আক্তার এসেছেন মেয়ে তাসনীম আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‘ভয় তো একটু আছেই। বাচ্চারা স্কুলে আসবে, সবার সঙ্গে কথা বলবে, মিশবে। বাচ্চারা যেন নিরাপদে থাকে, সেটাই আশা করি। তারপরও বলব, স্কুল খুলে দেওয়াটা ভালো হয়েছে।’ মেয়েকে স্কুলে ঢোকানোর আগে তিনি পই পই করে বলে দিয়েছেন, স্কুল যেভাবে বলেছে, ঠিক সেভাবে যেন চলে; বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যেন একটু দূরত্ব রেখে চলে।

ক্যাম্পাসের বাইরের চিত্র এক রকম, ভেতরটা আবার আলাদা। ফটকের মুখেই আজ শিক্ষকদের সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। পথে গোলাকার চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। দেয়ালে ঝুলছে নানা সতর্কতামূলক প্রচারপত্র। যেমন ‘নো হাই ফাইভ, অনলি হাই’, ‘ভিকিস আর স্মার্ট, বিকজ দে ওয়্যার মাস্ক’সহ আরও নানা কিছু। বসানো হয়েছে বেসিন।

default-image

ক্যাম্পাসে ঢোকানোর আগে প্রথমেই গার্ল গাইডসের ছাত্রীরা হাতে স্যানিটাইজার দিচ্ছিল। শিক্ষকেরা জ্বর মেপে তারপর ঢুকতে দিচ্ছিলেন শ্রেণিতে। ছাত্রীরা যেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলে, তা নিশ্চিতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে দেখা গেছে শিক্ষকদের। ছাত্রীদের কাউকে কাউকে ভুলে বন্ধুর খুব কাছাকাছি চলে আসতে দেখা গেছে, কেউ কেউ পুরো পথ পা টিপে টিপে এগোলেও ক্লাসে ঢোকার মুখে একটু তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। তবে কোনো কিছুই শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের চোখ এড়ায়নি।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুন্নাহার প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রীরা যেন নিরাপদে থাকে, সে জন্য সব ব্যবস্থা তাঁরা নিয়েছেন। শিক্ষকসংকট দেখা দিয়েছে কিছুটা। আগে যে ক্লাস একজন শিক্ষক নিতেন, সেই ক্লাসকে দুটি শাখায় ভাগ করতে হয়েছে। তাই শিক্ষকদের ওপর চাপটা একটু বেশি পড়ে যাচ্ছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা দক্ষ, তাঁরা সামলে নেবেন।

default-image

শিক্ষকদের সবাই আজ লাল রঙের শাড়ি পরে এসেছেন। আনন্দে উদ্বেল তাঁরাও। অধ্যক্ষ কামরুন্নাহার বললেন, করোনা পরিস্থিতিতেও তাঁরা রোজ এসেছেন। কিন্তু নিজেদের আর শিক্ষক মনে হতো না। ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক একে অন্যের, একজনের ওপর অন্যের অস্তিত্ব নির্ভর করে।

শুধু যে আজ ছাত্রী–শিক্ষক আর অভিভাবকেরাই প্রাণ ফিরে পেয়েছেন, তা-ই নয়। প্রাণ ফিরে পেয়েছে পুরো বেইলি রোড আর বেইলি রোডের অভিভাবক ছাউনি, ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ভ্রাম্যমাণ ডাব বা শিশুদের খেলনাসামগ্রীর দোকান আর আশপাশের স্টেশনারি দোকান। সন্তানেরা এক স্কুলে পড়ে, সেই সূত্রে অনেক অভিভাবকের মধ্যেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তাঁরাও আজ অনেক দিন পর স্কুল–কলেজের সামনের পুরোনো আড্ডায় ফিরেছেন। স্কুলের উল্টো পাশে ২০ বছরের পুরোনো স্টেশনারি ও লাইব্রেরি থিয়েটার কর্নার। বিক্রেতা মো. নজরুল ইসলাম বলছিলেন, আজ দুই ঘণ্টা আগে দোকান খুলেছেন। এত দিন খুলতেন, বিমর্ষ বসে থাকতেন। ছাত্রীরা এসেছে আজ, খাতা-কলম-পেনসিল কিনছে। খুব ভালো লাগছে তাঁর।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন