বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাজেস সেন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ফটোগ্রাফির জীবন ৪৫ বছরের। এর মধ্যে ৪০ বছর ধরে মৃত মানুষের ছবি তুলেছি। এখন সবার হাতে মুঠোফোন। তাই আগের মতো আর ডাক পাই না। তবু মাঝেমধ্যে ডাক পড়ে, তখন গিয়ে ছবি তুলি। কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।’

চাচার পরামর্শে ফটোগ্রাফি শুরু

রাজেস সেনের জন্ম পুরান ঢাকায়। বাবা তারকনাথ সেন। প্রথম দিকে শাঁখারীবাজারে শঙ্খশিল্পে জড়িত ছিলেন। পরে পুরান ঢাকার একটি হারবাল ওষুধ কারখানায় চাকরি নেন। তবে পাকিস্তান আমলে রাজেস সেনের চাচা অতীন্দ্র বর্মণের একটা স্টুডিও ছিল নিউমার্কেটে। মাঝেমধ্যে কিশোর রাজেস সেন চাচার স্টুডিওতে ঢুঁ মারতেন। তখন থেকে ধীরে ধীরে রাজেস সেন ফটোগ্রাফির প্রতি আকৃষ্ট হন। দেশ স্বাধীনের পর রাজেসের চাচা ভারতে চলে যান।

তবে চাচার কথামতো রাজেস সেন পুরান ঢাকার মুন সিনেমা হলের সামনে স্মৃতি স্টুডিওতে যেতেন। স্টুডিওটির মালিক বারিকুল সেলিমের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে স্মৃতি স্টুডিওতে ফটোগ্রাফারের কাজ শুরু করেন। সেই থেকে রাজেস ফটোগ্রাফার। পাঁচ বছর ওই স্টুডিওতে কাজ করেন। সেই সময় বেশ কিছু চলচ্চিত্রে স্থিরচিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। এর মধ্যে আছে ‘হাসু আমার হাসু’, ‘সীমার’, ‘কে তুমি’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র। এরপর ১৯৮১ সালে লক্ষ্মীবাজারের কণিকা স্টুডিওতে কাজ শুরু করেন রাজেস। তখন থেকে রাজেস মৃত মানুষের ছবি তোলা শুরু করেন।

default-image

ভয় পেয়ে দৌড় দেন রাজেস

হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ মারা গেলে স্মৃতি সংরক্ষণে তাঁর মুখের ছবি তুলে রাখার প্রচলন রয়েছে বলে জানান ফটোগ্রাফার রাজেস সেন। তিনি বলেন, ‘মূলত স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণের জন্য মৃত মানুষের ছবি তুলে বাঁধাই করে রাখার এই প্রচলন। কেউ শুধু পায়ের পাতার ছবি রাখেন। অনেকে হাতের ছবিটাও তুলে রাখেন।’

মৃত মানুষের ছবি তোলার শুরুর দিকে একবার ভয় পেয়েছিলেন রাজেস সেন। সেদিন রাতে তাঁর পোস্তগোলা শ্মশানে ডাক পড়ল। যথারীতি রাজেস ক্যামেরা নিয়ে হাজির শ্মশানে। ছবিও তোলা শুরু করেন। তবে বিপত্তি বাধল যখন লাশ কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে আসে।

রাজেসের ভাষায়, ‘রাতে সেদিন আমি মৃতদেহের ছবি তুলছিলাম। শ্মশানে মৃতদেহটি উপুড় করে রাখা হয়েছিল। আগুন যখন জ্বলতেছিল, তখন আমি মুখের ছবিটা তুলছিলাম। হঠাৎ মৃতদেহ কিছুটা ওপরের দিকে উঠতেছিল, সেই দৃশ্য দেখে তখন আমি ভয়ে দৌড় দিয়েছিলাম।’ অবশ্য পরে তাঁর ভয় কেটে যায়।

মৃত মানুষের ছবি তুলতে গিয়ে আরও একদিন শ্মশানে রাজেস অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। যখন ছবি তুলছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, কেউ একজন তাঁকে থাপ্পড় মেরেছেন।

রাজেস সেন বলেন, ‘মৃত মানুষের মুখের ছবি তোলা কঠিন এক কাজ। সেই কঠিন কাজ আমি করে আসছি বছরের পর বছর। এখন বয়স হয়েছে। তাই মাঝেমধ্যে মৃত্যুভাবনা আমাকেও পেয়ে বসে। তখন খুব খারাপ লাগে।’

রাজেসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১৯৮০ সালের পর পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, ঝুলনবাড়ী, রাধামোহন বসাক লেনে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের ছবি তিনি তুলেছেন। আগে অ্যানালগ ক্যামেরায় ছবি তুলে তা স্টুডিওতে ধোলাই করে ছবি বানিয়ে দিতেন। এ কাজ করে যে আয় হতো, তা দিয়ে স্ত্রী, তিন মেয়ে আর ছেলের মুখে ডাল-ভাত তুলে দিতেন। ফটোগ্রাফি করে তিন মেয়েকে বড় করেছেন, বিয়েও দিয়েছেন। ছেলেও বিয়ে করে আলাদা সংসার শুরু করেছেন। তবে ছেলে ফটোগ্রাফি পেশায় আসেননি, চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
ছবি তুলেই যাবেন
ফটোগ্রাফিজীবনের শেষ সময়ে ক্যামেরা রাজেস সেনের নিত্যসঙ্গী। স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন শাঁখারীবাজারে। স্থানীয় বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিবিধ অনুষ্ঠানে ছবি তোলার কাজে মাঝেমধ্যে তার ডাক পড়ে। তখন সেখানে ক্যামেরা নিয়ে ছুটে যান রাজেস। তবে মাঝেমধ্যে হতাশা তাঁকে ঘিরে ধরে। কারণ, ফটোগ্রাফির কাজ অনেক কমে গেছে। ছবি তুলে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।

default-image

রাজেস সেন বলেন, ‘লক্ষ্মীবাজারে আমার স্টুডিও ছিল, তখন ভালোই ছিলাম। তবে ২০০৮ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে আমার কাজ কমে যায়। মৃত মানুষের ছবি তোলার জন্য এখন ডাক পড়ে কম। তবে বিয়েবাড়ি, মন্দিরের নানা অনুষ্ঠানের ছবি তুলে যে আয় হয়, তা দিয়ে চলছে আমার জীবন। ফটোগ্রাফি আমার নেশা। মরণের আগপর্যন্ত এ নেশা আমি ছাড়তে পারব না। যত দিন সুস্থ আছি, তত দিন ছবি তুলে যাব।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন