default-image

গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ি রুটে বাস চালান মো. নয়ন। তিন মেয়ে, স্ত্রীসহ পাঁচজনের সংসার তাঁর। ছোট দুই মেয়ে বাদে বাসার তিন সদস্য রোজা রাখেন। মজার কিছু খাওয়ার জন্য নয়নের কাছে সন্তান বায়না ধরলে স্ত্রী কানিজ ফাতেমার দিকে সন্তানকে ঠেলে দেন। কানিজ ফাতেমা এটা–ওটা বোঝান তাদের।


করোনাকালে বাসচালক মো. নয়ন ও তাঁর পরিবার চলছে এভাবে। আজ রোববার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গণপরিবহন আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে সবকিছু খোলা। আর্থিক সহযোগিতা বা প্রণোদনা যা-ই বলা হোক, পরিবহনশ্রমিকদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। তাঁরা পাননি। এবার লকডাউনের পর ঢাকা জেলা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে ১০ কেজি চাল, ২ কেজি ডাল, ১ লিটার তেল, ২ কেজি আলু পেয়েছেন। এর মধ্যে দুই মাসের ঋণের কিস্তি জমেছে, বাড়িভাড়াও বাকি পড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে মাসে ১৫ দিন কাজ করেন। কপাল ভালো হলে দিনে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ও করেন কখনো কখনো, এখন পকেট শূন্য। তিনি যেকোনো মূল্যে বাস নিয়ে রাস্তায় নামতে চান।


আজ সকালে গাবতলী, সায়েদাবাদে পরিবহনশ্রমিকরা বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেন। গণপরিবহন চালুর দাবিতে নেতারা যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, তখন আশপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে শ্রমিকেরা বসে গল্প করছিলেন। শ্রমিকদের মধ্যেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব। একটি পক্ষ চায় গণপরিবহন খুলে দেওয়া হোক। অন্য পক্ষটির আশঙ্কা, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অবাধে যাতায়াত করোনা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। তবে দুই পক্ষই একটা বিষয়ে একমত, তা হলো গাড়ির চাকা ঘুরলে তাঁদের জীবনের চাকা ঘোরে। নইলে সব বন্ধ।

বিজ্ঞাপন
default-image

সোহাগ কাউন্টারের কর্মী মো. মজনু কথা বলছিলেন আরেক পরিবহনশ্রমিক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। মো. মজনু বলেন, লকডাউন না হলে মানুষ মরবে হরেদরে। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত হওয়াই ভালো। শহিদুল ইসলাস তাঁর কথার সঙ্গে একমত নন। তিনি বলছিলেন, ‘সব খুইলা দিয়া শুধু বাস বন্ধ। এইডা কেমুন নিয়ম। হাইয়েস গাড়িতে মানুষ ঢাকা ছাড়তাছে গাদাগাদি কইরা। কারও সঙ্গে কারও এক ইঞ্চি ফাঁক নাই।’ শ্রমিকদের কেউ কেউ শহিদুলের কথায় সমর্থন দেন।

তাঁরা জানান, গাড়ি চললে গাড়িচালক, হেল্পার ও অন্য কর্মীরা টাকা পান। নইলে পান না। বাস পাহারা দেওয়ার জন্য দিনে ১০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয় তাঁদের। এই টাকায় তাঁরা চলতে পারছেন না। গত বছরও লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ খোঁজখবর রেখেছিল। এ বছর সে অর্থে সহায়তার পরিমাণ কম। মালিকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁদের গাড়ি ব্যাংকঋণ নিয়ে কেনা। গাড়ি বসে থাকলে তাঁদের আয় বন্ধ। তারপরও কোনো কোনো মালিক চাল, ডাল, আলু ও পেঁয়াজ দিয়েছেন। প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ খুবই সামান্য।


এক শ্রমিক বলেন, ‘মার্কেট তো খুইলা দিছেন। আপনি পোলাপানের জন্য মার্কেট করতেছেন। আমাদের পোলাপান চায়া রইছে।’


পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিকদের চাঁদা তোলার অভিযোগ পুরোনো। পরিবহন খাতে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়। হাইওয়ে পুলিশের হিসাবে মহাসড়কে চলাচলকারী ৫৮ হাজার ৭১৯টি যানবাহন থেকে বছরে চাঁদা ওঠে ৮৭ কোটি টাকা। দৈনিক মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা, বাস-মিনিবাস নির্দিষ্ট পথে নামানোর জন্য মালিক সমিতির চাঁদা এবং রাজধানী ও এর আশপাশে কোম্পানির অধীনে বাস চালাতে দৈনিক ওয়েবিল বা গেট পাস (জিপি) চাঁদা—এই তিন নামে তোলা হয় চাকা। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নামে প্রতিদিন প্রতিটি বাস-ট্রাক থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলা হয় ৭০ টাকা করে। সারা দেশের প্রায় পৌনে তিন লাখ বাস, মিনিবাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থেকে দিনে প্রায় দুই কোটি টাকা চাঁদা ওঠে।

তারপরও শ্রমিকেরা করোনায় ভুগছেন কেন? জানতে চাইলে ঢাকা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. আব্বাস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য এই টাকা ব্যবহার হয়। সারা দেশে ২৩০টি ইউনিয়ন আছে, ওই ইউনিয়নগুলো তাদের দলভুক্ত শ্রমিকদের করোনায় ত্রাণ দিচ্ছে, যদিও এই ত্রাণ যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, ‘তোলা দুধে পোলা বাঁচে না’। তাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। গণপরিবহন রাস্তায় নামতে না দিলে শুধু ত্রাণ দিয়ে চলবে না। তা ছাড়া তহবিলের জমা টাকা বছরজুড়েই শ্রমিকদের জন্য খরচ হয়, মামলায় পড়লে তাঁদের ছাড়িয়ে আনতেও তহবিল থেকে টাকা দেওয়া হয়। অসুস্থতা, বিয়েশাদিতেও খরচাপাতি দেওয়া হয়।


পরিবহনের শ্রমিক–মালিকেরা আজ তিনটি দাবি তোলেন। এগুলো হলো, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মোট আসনের অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে, সড়ক পরিবহনশ্রমিকদের আর্থিক অনুদান ও খাদ্যসহায়তা দিতে হবে এবং সারা দেশে বাস ও ট্রাক টার্মিনালগুলোতে পরিবহনশ্রমিকদের জন্য ১০ টাকায় ওএমএসের চাল দিতে হবে। এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪ মে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।


এদিকে সায়েদাবাদেও গণপরিবহন চলাচলসহ তিন দফা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ঢাকা মহানগর সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা। আজ সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় এ বিক্ষোভ মিছিল হয়। বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন অন্তত ৩০০ পরিবহনশ্রমিক। পরিবহনশ্রমিকেরা বলছেন, অবিলম্বে গণপরিবহনসহ সব যানবাহন চালুর অনুমতি দিতে হবে। করোনায় এক মাসের বেশি সময় ধরে পরিবহন চলাচল বন্ধ। এতে বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পরিবহনশ্রমিকেরা। এ জন্য শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া পরিবহনশ্রমিক আবদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে কোনো কাজ নেই। অনেক কষ্টে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। গত মাসের ঘরভাড়াও তিনি দিতে পারেনি। আয় ছাড়া এভাবে আর তার পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আরেক পরিবহনশ্রমিক শামসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দোকানপাট খোলা। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। তাহলে পরিবহনশ্রমিকেরা কেন এভাবে দিনের পর দিন কষ্ট করবেন।

সায়েদাবাদ আন্তজেলা ও নগর বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির কার্যকরী সভাপতি জলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘লকডাউনে পরিবহনশ্রমিকদের মধ্যে এত কষ্টে আর কেউ নেই। গত বছরের লকডাউনের সময় পরিবহনশ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েছিলেন। এ বছর এক মাসের বেশি সময় ধরে তাঁরা বেকার ঘরে বসে আছেন। অবিলম্বে পরিবহন চালু করার অনুমতি দেওয়া হোক। শ্রমিকদের জন্য টার্মিনালে ১০ টাকায় ওএমএসের চাল বিক্রি করার দাবি জানাচ্ছি।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন