বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকায় ময়লা সংগ্রহের কাজটি সিটি করপোরেশনের। তারা এ জন্য পরিচ্ছন্ন কর আদায় করে। যদিও বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহ করে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রে নেওয়ার কাজটি হচ্ছে বেসরকারিভাবে। একসময় যা সামাজিক উদ্যোগ ছিল, তা এখন ‘নিয়ন্ত্রণ করছেন’ ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও অনুসারীরা। তাঁরাই মানুষকে জিম্মি করে বাড়তি টাকা নিচ্ছেন।

ঢাকায় ময়লা সংগ্রহ নিয়ে ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর ‘রাজধানীতে ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। এতে বলা হয়, ময়লা-বাণিজ্য করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় কাউন্সিলরের লোকজন। এরপর গত ১১ জানুয়ারি ‘ময়লাবাণিজ্যে কাউন্সিলররা’ এবং ‘নতুন নিয়মেও পুরোনো অনিয়ম’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়।

ঢাকা দক্ষিণে মেয়র হিসেবে শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেন ২০২০ সালের মে মাসে। ওই বছর আগস্টে ময়লা সংগ্রহে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি ওয়ার্ডে একটি প্রতিষ্ঠানকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ দেওয়া হয়। ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এরপর কয়েক মাস নিয়ম মানা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে দক্ষিণের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রথম আলোকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, তথ্যপ্রমাণসহ বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হবে।

ওদিকে গত বছর ডিসেম্বর মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বোর্ড সভায় উচ্চবিত্তদের বসবাসের এলাকায় মাসে ১০০ টাকা ও অনুন্নত এলাকায় ৫০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়, কার্যকর হয়নি। সেখানে ইচ্ছেমতো ফি নির্ধারণ করে টাকা আদায় করা হচ্ছে।

দক্ষিণে আবার ‘অনিয়ম’

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখন ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব দেয় দরপত্রের মাধ্যমে। বর্তমানে দক্ষিণের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৭৪টিতে দরপত্রের মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ময়লা সংগ্রহ করছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দক্ষিণ সিটি ময়লা সংগ্রহের কাজ ইজারা দিয়ে আয় করেছে ৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ময়লা সংগ্রহে বাড়তি টাকা নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে গত দেড় বছরে তাদের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে দেড় শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সতর্কও করেছে। কিন্তু শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফেরেনি।

যেমন দক্ষিণ সিটির ১ নম্বর ওয়ার্ডের (খিলগাঁও) বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পাওয়া মা ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে কয়েকজন বাসিন্দা গত ৭ জুলাই দক্ষিণ সিটির মেয়রের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেন যে তাঁদের এলাকায় একেকটি ফ্ল্যাট থেকে সন্ত্রাসী কায়দায় মাসে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়, যেখানে ১০০ টাকা নেওয়ার কথা। সর্বোচ্চ নেওয়া হয় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা করে।

সূত্র জানিয়েছে, এ অভিযোগের পর মেয়র ময়লা সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানকে ডেকে সতর্ক করে দেন। তারপর থেকে টাকা কমিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে তা-ও অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির বেশি। মা ট্রেডার্সের মালিক মঈনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দোকান থেকে ১০০ টাকা করে নিতে বলা হয়েছে। সংগ্রহকারীরা কেউ এর বেশি নিলে এবং সে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৭৪টি ওয়ার্ডে যেসব প্রতিষ্ঠান ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগের মালিকানা স্থানীয় কাউন্সিলের ঘনিষ্ঠজন অথবা ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীর হাতে।

দক্ষিণ সিটির অন্তত আটটি ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনকি অতিষ্ঠ হয়ে ২ অক্টোবর দক্ষিণ সিটির ৬০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে ‘চাঁদাবাজি’ বন্ধের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধও করেন। ৬০ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন শনির আখড়ার একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক প্রথম আলোকে বলেন, মাসে ৩০ টাকা নেওয়ার বদলে তাদের কাছ থেকে দিনে ৩০ টাকা ধরে মাসে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়।

তাহলে গৃহকর কেন?

সিটি করপোরেশন বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে পরিচ্ছন্ন কর আদায় করে। কিন্তু ময়লা সংগ্রহের জন্য মানুষকে টাকা দিতে হয়। সেই কাজের দায়িত্ব ইজারা দিয়ে করপোরেশন আয় করছে। প্রশ্ন উঠেছে, যেটা নিজের দায়িত্ব, সেটা সিটি করপোরেশন আয়ের উৎসে পরিণত করবে কেন?

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খানের বসবাস ধানমন্ডিতে। তাঁর বাসা থেকেও মাসে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গৃহকর দেওয়ার পরও ময়লা সংগ্রহের জন্য নাগরিকেরা টাকা কেন দেবেন? যদি দেবেনই, সেটা সিটি করপোরেশন নিক। তাঁরা কর্মী নিয়োগ দিয়ে ময়লা সংগ্রহ করুক। মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে একটি অনৈতিক চর্চার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন