default-image

বড় কোনো শিল্পকারখানা নেই। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বা মেট্রোরেলের মতো উন্নয়নকাজও চলছে না। তারপরও রাজধানীর সবচেয়ে দূষিত বাতাস এলিফ্যান্ট রোড এলাকায়।

কেন এত বেশি দূষণ, তা উঠে এসেছে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) গবেষণায়। ২০ মার্চ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়, এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর ফলে ধোঁয়া তৈরি হয়। তাতেই বাতাসে বাড়তি দূষিত পদার্থ যোগ হয়।

এই দাবির সত্যতা পাওয়া গেল সরেজমিনে গিয়ে। ২১ মার্চ কয়েক ঘণ্টা এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, কাঁটাবন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ আবাসিক এলাকা ঘুরে অন্তত সাতটি জায়গায় ময়লা পোড়ানোর পর রাস্তায় পড়ে থাকা ছাই দেখা যায়। এর মধ্যে একটি জায়গা ছিল এলিফ্যান্ট রোডে বাটার সিগন্যাল মোড় থেকে গাউছিয়া মার্কেটের দিকে যাওয়ার রাস্তার মুখে। বেলা একটার দিকে দেখা যায়, সেখানে ফুটপাতের কোনায় স্তূপাকারে পড়ে আছে প্লাস্টিকপণ্য, ককশিটসহ নানা আবর্জনা। তাতে পিট পিট করে আগুন জ্বলছে। কালো ধোঁয়া উড়ছে।

একটু দূরেই আবদুল মতিনের ভাঙারির দোকান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন ময়লা জড়ো করে এভাবে আগুনে পুড়িয়ে দেন। ১২ বছর ধরে তিনি সেখানে দোকানদারি করছেন। সব সময়ই এ দৃশ্য দেখে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারাও জানালেন ময়লা পোড়ানোর বিষয়ে। বাটার সিগন্যাল থেকে গাউছিয়া মার্কেট যেতে সড়কের পাশেই একটি ভবনে মাহমুদুল হাসানের বাসা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, করপোরেশনের কর্মীরা রাতে যখন আগুন দিয়ে ময়লা পোড়ান, তখন জানালা খোলা রাখা যায় না। আবার গরমের কারণে বন্ধও রাখা যায় না। সে এক দমবন্ধ দশা।

স্ট্যামফোর্ডের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের গবেষণা বলছে, এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বায়ুদূষণ বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। এ এলাকায় প্রতি ঘনমিটার বাতাসে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা দাঁড়িয়েছে ৪৫৮ মাইক্রোগ্রাম, যা দৈনিক ৬৫ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সহনীয়।

বিজ্ঞাপন
—সড়কে ঝাড়ু দিয়ে জমা করা ময়লার একটা অংশ গভীর রাতে ফুটপাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
—সড়কে ময়লার বড় অংশ থাকে প্লাস্টিক, যা পোড়ানোর কারণে বিষাক্ত উপাদান বাতাসে যুক্ত হয়।

অবশ্য রাজধানীর কোনো এলাকায়ই নির্মল বায়ুর খোঁজ পাওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানেই থাকে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী বৈশ্বিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের গতকাল সন্ধ্যার পর্যবেক্ষণে ঢাকা ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত শহর।

স্ট্যামফোর্ডের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের বড় কারণ রাস্তার ধুলা, খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণকাজ, কালো ধোঁয়া এবং নির্মাণসামগ্রী রাস্তায় ফেলে রাখা ও খোলা অবস্থায় পরিবহন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ময়লা পোড়ানো। পাড়া–মহল্লায় বায়ুদূষণের এটি অন্যতম কারণ।

শুধু এলিফ্যান্ট রোড নয়

দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর একটি অংশ সড়কে জমা হওয়া। বড় সড়কগুলোতে ঝাড়ু দিয়ে ময়লা বিভিন্ন জায়গায় জমা করে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। কাজটি চলে রাত ৯টা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত। অভিযোগ, সড়কে ঝাড়ু দিয়ে জমা করা ময়লার একটা অংশ গভীর রাতে ফুটপাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

শুধু এলিফ্যান্ট রোড এলাকা নয়, কাজটি চলে রাজধানীজুড়েই। কোথাও কম, কোথাও বেশি। স্ট্যামফোর্ডের গবেষকদের আরেকটি জরিপে এসেছে, ঢাকায় বেশি পরিমাণে ময়লা পোড়ানো হয় মোট ২৩টি জায়গায়। এর মধ্যে ১৩টি আবাসিক ও মিশ্র এলাকা, যেখানে বসতি আছে। ২১ মার্চ রাজধানীর খিলগাঁও, ধানমন্ডি, সেগুনবাগিচা এলাকা ঘুরেও বিভিন্ন জায়গায় রাতে ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর পর ছাই পড়ে থাকতে দেখা যায়।

ময়লা পোড়ানোর ধোঁয়ায় শরীরের তেজস্ক্রিয়া বেড়ে হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান। দীর্ঘ মেয়াদে এই ধোঁয়া ফুসফুসে ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করে।
ডা. আসিফ মুজতবা মাহমুদ, মহাসচিব, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সড়কে ময়লা পোড়ানোর দুটি কারণ জানা গেছে। প্রথমত, কাজে ফাঁকি দেওয়া। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি অংশ ঝাড়ু দিয়ে আবর্জনা জড়ো করে তা গাড়িতে তুলে দেওয়ার কষ্টটি করতে চায় না। দ্বিতীয় কারণ, যে গাড়িতে করে ময়লা সরিয়ে নেওয়া হয়, তাতে অনেক সময় স্থান সংকুলান হয় না। আবার অনেক জায়গায় ময়লার গাড়ি নিয়মিত যায় না।

৩০ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করা হাজারীবাগের গণকটুলির এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, অনেকে ময়লা রাস্তায় রেখেই আগুন ধরিয়ে দেয়। গাড়ি তুলে দেওয়ার কষ্ট করতে চায় না।

নিজেদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যে ময়লা পুড়িয়ে দূষণ বাড়াচ্ছেন, তা–ও অজানা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মো. বদরুল আমিন বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এ কাজটি করার কথা নয়। যাঁরা ময়লা-আবর্জনা আগুনে পোড়ান, তাঁরা দুর্দশাগ্রস্ত। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পোড়া ধোঁয়ায় বিষাক্ত উপাদান

রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতার কাজটি করে না বললেই চলে। সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে ময়লা পুড়িয়ে দেয়। বায়ু গবেষকেরা বলছেন, সড়কে পড়ে থাকা ময়লার বড় অংশ থাকে প্লাস্টিক, যা পোড়ানোর কারণে ডাইঅক্সিন, ফুরান, মার্কারি, পলিক্লোরিনেটেড বাই ফিনাইলের মতো বিষাক্ত উপাদান বাতাসে যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কার্বন ডাই–অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই–অক্সাইডসহ অন্তত ছয়টি বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়।

বাংলাদেশ লাং (ফুসফুস) ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আসিফ মুজতবা মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ময়লা পোড়ানোর ধোঁয়ায় শরীরের তেজস্ক্রিয়া বেড়ে হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান। দীর্ঘ মেয়াদে এই ধোঁয়া ফুসফুসে ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন