default-image

‘গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বিশ্বে বসবাসের অনুপযোগী শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে ঢাকা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণই এর মূল কারণ। আর এমন নগরায়ণের কারণে বছর বছর বেড়েছে ঢাকার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর গবেষণা অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে ঢাকা শহরের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা চার থেকে সাড়ে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভাটারা এলাকায়।

নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, ‘বৈশ্বিক তাপমাত্রা দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। আর মাটির তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়লেই জনজীবনে ব্যাপক অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। সেখানে ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়া খুবই আশঙ্কাজনক। এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সব ক্ষেত্রেই পড়বে।’

ঢাকা শহরের মাটির তাপমাত্রা এত বাড়ার কারণ সম্পর্কে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শহরে শুধু ঘরবাড়িই থাকবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষিজমি, সবুজ অঞ্চল, উন্মুক্ত স্থান ও জলাধার রাখতে হবে। কিন্তু ঢাকা শহরে কৃষিজমি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। জলাধার যা ছিল, তারও বড় একটি অংশ ভরাট করা হয়েছে। এতে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে।

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মাহবুবা মেহরুনের করা গবেষণার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং ল্যাবে উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে করা এই গবেষণায় ঢাকা শহরের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে জলাশয় কমে যাওয়ার একটি সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।

হাসান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, ‘বিল্ট-আপ এরিয়া (ভবনসহ নানান অবকাঠামো তৈরি)’ বৃদ্ধি, জলাভূমি কমা, ঘনবসতিসহ নানা বিষয় জড়িত। তবে সবচেয়ে বেশি দায়ী জলাভূমি কমে যাওয়া। তিনি বলেন, ‘মানবদেহের কিডনির মতো জলাভূমি একটি শহরের কিডনি হিসেবে কাজ করে। শহরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমাতেও এটি ভূমিকা রাখে। ঢাকা শহরের জলাভূমির বেশির ভাগই এখন ভরাট করা হয়েছে।’

মাহবুবা মেহরুনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে ঢাকা শহরের মোট ভূমির ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ ছিল জলাভূমি, আর বিল্ট-আপ এরিয়া ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। ২০১৫ সালে জলাভূমি কমে হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ, আর বিল্ট-আপ এরিয়া বেড়ে হয়েছে ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।

গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা শহরে ভূপৃষ্ঠের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সময়ে ঢাকার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকার মাটির তাপমাত্রা ১৫-১৮ ডিগ্রির সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল। আর ২০০০ সালের জানুয়ারিতে মাটির তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ১৪ দশমিক ৭১ এবং সর্বোচ্চ ২৩ দশমিক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হয় ১৮ দশমিক ৮০ এবং সর্বোচ্চ হয় ২৮ দশমিক ৭৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন ঢাকার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকার মাটির তাপ ২১-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।

৮০ শতাংশের বেশি এলাকার মাটির তাপ ২১-৩০ ডিগ্রি হওয়ার কারণ সম্পর্কে গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া হাসান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ঢাকা শহরের নগরায়ণ পরিকল্পিতভাবে হয়নি। বেশির ভাগ এলাকাই গড়ে উঠেছে জলাভূমি ভরাট করে। ভরাটের জন্য বালু ব্যবহার করা হয়েছে। বালু অতিমাত্রায় তাপ শোষণ করে, এ জন্য ঢাকা শহরের বেশির ভাগ এলাকার ভূমির তাপমাত্রা বেশি। বালু দিয়ে ভরাট করার পর তার ওপর ঘাস লাগালে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার কিছুটা হলেও কমত।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মাটির তাপ বাড়ার কারণে শহরের আবহাওয়াও উষ্ণ হয়। এতে মানুষের স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা দেখা দেয়, চলাচলে মানুষের অস্বস্তি বাড়ে। এ ছাড়া গরম থেকে প্রশান্তির জন্য বৈদ্যুতিক পাখা ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। এতে অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরের সবুজ অঞ্চল, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, গাছপালা যেটুকু আছে, তা আর কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না। যেকোনো মূল্যে জলাভূমিগুলো রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি বাড়ির ছাদে বাগান করলেও সেটি তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করবে। আর এসব না করলে ঢাকা শহরের মাটির তাপ আরও বাড়বে। এতে শহরে বাস করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন