default-image

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বদলে গেছে রাজধানীর চিরচেনা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দৃশ্যপট। দিনরাত লঞ্চের জোরালো হুইসেলে বুড়িগঙ্গার বাতাস কম্পমান থাকত। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা লঞ্চগুলো মুখর থাকত মানুষের পদচারণে। তবে সেই লঞ্চঘাটে চার দিন কোনো লঞ্চ ভেড়েনি।

জনশূন্য পন্টুন। বুড়িগঙ্গার কুচকুচে কালো পানি ঢেউ খাচ্ছে। তবে পন্টুন থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে বুড়িগঙ্গার বুক দখল করে জটলা পাকিয়ে অলস বসে আছে ৮০টি লঞ্চ
সরকারি নির্দেশে গত সোমবার থেকে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও লঞ্চের কোনো কর্মচারী বাড়ি ফেরেননি। আছেন সবাই লঞ্চে। কর্মচারী সবাই লঞ্চেই ঘুমান। খাওয়াদাওয়া সারেন লঞ্চে। আড্ডা দিয়ে সময় কাটছে। আগের লকডাউনের সময়ের কষ্টের কথা মাথায় আসছে বারবার।

লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে মহানগরে বাস চলাচলের অনুমতি মিলেছে। দোকানপাটও খুলছে। তাহলে লঞ্চ চলাচল কেন বন্ধ রাখবে সরকার? আমরা তো স্বাস্থ্যবিধি মনে লঞ্চের যাত্রী নিচ্ছিলাম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লঞ্চ চলাচল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসবে, সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। করোনায় আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। গত বছরের তিন মাস পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। আমরা তো কোনো সরকারি প্রণোদনা পাইনি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

বরগুনার মোহাম্মদ খোকন সুকানি হিসেবে চাকরি করেন মর্নিং সান-৫ নামের একটি লঞ্চে। লকডাউনে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চার দিন ধরে তিনি লঞ্চে অবস্থান করছেন। মুঠোফোনে পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। তবে লকডাউনে গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা বারবার তাঁর মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। খোকন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার দিন ধরে লঞ্চ চলাচল বন্ধ আছে। আমরা সব কর্মচারী আটকে আছি লঞ্চে। লঞ্চ চললে দুটি পয়সা আয় হয়। গতবারের লকডাউনে অনেক দিন লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। ঠিক সময়ে বেতন পাইনি। এমনিতে আমাদের সীমিত বেতন। লঞ্চ না চললে বেতন ঠিকমতো পাব?’
লঞ্চ মালিক সমিতির তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত লঞ্চের সংখ্যা ৬৮০টি। গড়ে প্রতিটি লঞ্চে ২৫ থেকে ৪০ জন কর্মচারী আছেন। সেই হিসাবে লঞ্চের কর্মচারীর সংখ্যা ২০ হাজার। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় তাঁরা অলস সময় পার করছেন।

default-image

লঞ্চ চালাতে নানা পদের লোকের দরকার হয়। লঞ্চের মাস্টার থেকে লস্কর—লঞ্চ চালাতে সবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। তবে লঞ্চের সব কর্মচারীর অভিযোগ, যেভাবে দিনরাত পরিশ্রম করেন, সেই তুলনায় তাঁদের বেতন–ভাতা একেবারেই কম। লঞ্চ কর্মচারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লঞ্চ যিনি চালান, তিনি মাস্টার। তাঁর বেতন মাসে কমবেশি ১৫ হাজার টাকা। লঞ্চের যিনি সুকানি, যিনি লঞ্চের মাস্টারকে সহযোগিতা করেন, তাঁর বেতন ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর যিনি লঞ্চ ঘাটে বাঁধেন, লঞ্চ পরিষ্কার রাখেন, তাঁর পদ লস্কর। একজন লস্করের বেতন সাকল্যে ৭ হাজার টাকার মতো। লঞ্চের কর্মচারীদের বেতনের পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার সুযোগ দেয় মালিকপক্ষ। কর্মচারীরা থাকার জন্য লঞ্চের একটি কেবিন পান। দুপুর ও রাতের খাওয়ার খরচও মালিকপক্ষ দেয়।

তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে কম আয়ের বেতনে সংসার চালাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খান লঞ্চের কর্মচারীরা। বেশির ভাগ কর্মীর স্ত্রী-সন্তান বসবাস করে গ্রামে। তাঁদের বেশির ভাগের বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুরে। লঞ্চে কাজ করে মাস শেষে বেতন পেলে তাঁর বড় অংশ গ্রামে স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন তাঁরা। লকডাউনে বুড়িগঙ্গায় আটকে থাকা কর্মচারীদের একটাই শঙ্কা, যদি বেতন না পান, তাহলে গ্রামে কীভাবে স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠাবেন, কীভাবে তাঁর সংসার চলবে।

default-image

এমভি পারাবত-৯ লঞ্চের লস্কর শাহীন আক্ষেপের সুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক কষ্টে কাটছে আমাদের সময়। লঞ্চ চললে দুই টাকা ইনকাম করতে পারতাম। লঞ্চ তো বহা (বসা)। বেতন পাই মাত্র সাত হাজার টাকা। লকডাউনে কোনো জায়গা যাওন (যাওয়া) যায় না, চলন (চলা) যায় না। গতবারের লকডাউনে খুব খারাপ সময় গিয়েছিল। অনেক কষ্টে আছিলাম। কামাই (কাজ) আছিল না, রুজি আছিল না। খাইতেও পারিনি ঠিকমতো। লঞ্চ খুলে দিক, সেটাই আমরা চাই।’

লঞ্চমালিক ও কর্মচারীদের অনেকে আক্ষেপ করে বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঢাকা শহরে বাস চলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। একইভাবে দোকানপাটও খোলার অনুমতি মিলেছে। তাহলে কেন লঞ্চ চলাচলের অনুমতি মিলবে না?
লঞ্চ চলাচল প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক প্রথম আলোকে বলেন, করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাত দিনের জন্য আন্তজেলা লঞ্চ চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। লঞ্চ চলাচলের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই এ ব্যাপারে বৈঠক হবে।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন