জাদুঘরের সমন্বয়কারী কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন ভূঁঞা বলেন, মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসনির্ভর তথ্য সমুন্নত রেখে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাস মানুষকে জানানো এ জাদুঘরের মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর বিবর্তন ও স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরাও লক্ষ্য।

default-image

জাদুঘরে ঢুকতেই প্রথমে আছে বিজয় অঙ্গন। এই গ্যালারির ভেতরে ‘ইতিহাস দর্পণ: শশাঙ্ক থেকে শেখ মুজিব’ এই অভিনব উদ্যোগ। এখানে উঠে এসেছে বাংলার ভৌগোলিক ইতিহাস, কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে নানা জনযুদ্ধের স্মারক, পলাশীর যুদ্ধ, সিপাহি বিদ্রোহ। শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়, আছে পলাশীর যুদ্ধসহ ব্রিটিশ আমলে ব্যবহৃত কয়েকটি কামান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেখতে দেখতে দর্শকেরা এসে পড়বেন বিশাল গোলাকার কাচে ঘেরা এক প্রান্তে। বিজয়ের মুক্তির আনন্দ যেন ধরা পড়ে ভবনের এই উন্মুক্ত কাঠামোর মধ্যে। কাচ ভেদ করে আসা প্রাকৃতিক আলোয় ভরা এ প্রান্তে চৌখুপি অঙ্কনে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে নিরস্ত্র বাঙালির প্রতিবাদ থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের লড়াই। এর নকশাকার স্থপতি তানজিম হাসান।

প্রাচীন আমলের দুর্গের আদলেই গড়ে উঠেছে এখনকার সেনানিবাস। বাংলার প্রাচীন সেই দুর্গগুলোর ইতিহাস আছে, আছে রেপ্লিকা। আছে অপারেশন সার্চলাইট থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের বড় বড় অপারেশনের প্রামাণ্য দলিল।

default-image

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে সেনাবাহিনীর কর্নারে গেলে অন্য রকম এক আবহ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীর বাংকারে থেকে লড়াইয়ের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে। আছে মুজিব ব্যাটারি কামান থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ব্যবহৃত গাড়ি। একটি অংশে অজস্র অস্ত্রের সম্ভার। মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্র শুধু নয়, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে থেকে যুদ্ধ করে জয় করা অস্ত্রও আছে।

এখানকার যুদ্ধসরঞ্জাম ঘূর্ণমান টেবিলে প্রদর্শিত হচ্ছে। তাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে দর্শনার্থীরা সরঞ্জামের পুরোটা দেখতে পারেন।

default-image

বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরের ভিন্নতা হলো, এখানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর ভাগ করে বিশাল এক ইন্টারঅ্যাকটিভ মানচিত্র আছে। কোনো একটি সেক্টর স্পর্শ করলেই সেই এলাকা, সেক্টর প্রধানের নাম–পরিচয়, গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনসহ আদ্যোপান্ত উঠে আসবে। সঙ্গে থাকছে ভিডিও। আরেকটি ট্যাবে রয়েছে ২৪ হাজার সেনা মুক্তিযোদ্ধার তথ্য।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ইন্টারঅ্যাকটিভ উপস্থাপনা মুগ্ধ করেছে বাসাবো থেকে আসা দর্শনার্থী মো. মামুনুর রশীদকে। সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন তিনি। বললেন, ‘বাংলাদেশের কোনো জাদুঘরে এমন উপস্থাপনা দেখিনি। এখানে শুধু দেখানো নয়, শেখানোর আয়োজন আছে।’

বিমানবাহিনীর গ্যালারিতে আছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত নানা স্মারক। উড়োজাহাজের নানা যন্ত্রাংশও লক্ষ্য করার মতো। উপস্থিত দর্শনার্থীদের সেসব সম্পর্কে জানাচ্ছেন একাধিক ব্যক্তি।

নৌবাহিনীর গ্যালারিতে গেলে দর্শনার্থীরা যেন হারিয়ে যাবেন সমুদ্রতলের রাজ্যে। সেখানে রাখা সাবমেরিনে ঢুকে নৌযুদ্ধের আবহ বোঝা যায়। আছে সমুদ্রতলের পরিবেশের উপস্থাপনা। সেখানে বিচরণ করা মাছ ও নানা জলজ প্রাণীর ছায়া প্রদর্শনীতে হুটোপুটি করছিল শিশু আলিফ রহমান। মতিঝিল মডেল হাইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর এই প্রথম আসা। আবারও আসবে বলে জানাল।

default-image

মুক্তিযুদ্ধেই শুধু নয়, দেশের নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে অবদান। একটি গ্যালারিতে সে–সংক্রান্ত নানা তথ্য–উপাত্ত ও সম্ভার রয়েছে। এরই মধ্যে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা।

বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরে আছে একটি সিনেপ্লেক্স, বিশাল পাঠাগার, মিলনায়তন, ক্যাফেটেরিয়া। একটি সু্৵ভেনির শপও বিক্রি শুরু করেছে।

জাদুঘরের সহকারী স্টোর কিপার মো. আসাদুল্লাহ জানান, দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর থেকে বিপুল লোকসমাগম হচ্ছে।

সকাল ও বিকেল দুই দফায় জাদুঘর খোলে। বুধবার বন্ধ। শুক্রবার বাদে অন্য দিনগুলোতে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত খোলা। আবার শুরু বেলা ৩টা থেকে, চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। শুক্রবার শুধু বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা। তবে রমজান মাসে বুধ ও শুক্রবার জাদুঘর বন্ধ থাকবে। অন্য দিনগুলোতে খোলা থাকবে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত।

এ জাদুঘরের স্থপতি আলী ইমাম এবং বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন