default-image

ঢাকা ওয়াসার দায়িত্ব মূলত তিনটি—পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসন। এ তিন কাজেই সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের ‘উল্লেখযোগ্য’ সাফল্য খুঁজে পেয়ে তাঁর মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব পাস করেছে ঢাকা ওয়াসা বোর্ড। অথচ তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র। জলাবদ্ধতার জন্য তাঁরা ওয়াসাকে দায়ী করেছেন।

কাগজে–কলমে তাকসিম এ খানের বিরাট ‘সাফল্যের’ সঙ্গে বাস্তবের ব্যবধান অনেক। ওয়াসার লাইনে আসা পানি না ফুটিয়ে বা পরিশোধন না করে সরাসরি পান করেন, এমন মানুষ ঢাকায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। বহু বাসায় ওয়াসার লাইনে নিয়মিত পানি আসে না। আর পয়োনিষ্কাশন এখনো মহাপরিকল্পনানির্ভর, ভারী বৃষ্টি হলে ঢাকার বড় অংশ ডুববে, এটি এখন মানুষ একরকম মেনেই নিয়েছেন। ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভিযোগও পুরোনো।

এরপরও ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা ওয়াসার বোর্ড এমডি পদে তাকসিম এ খানের পুনর্নিয়োগসংক্রান্ত প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। ওই সভায় তাঁকে ষষ্ঠবারের মতো নিয়োগ দিতে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) মাহমুদুল হাসান।

পানি না ফুটিয়ে বা পরিশোধন না করে সরাসরি পান করেন, এমন মানুষ ঢাকায় খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি তাকসিম এ খানের যে সাফল্যগাথা তুলে ধরেন, তা মেনে নেন বোর্ডের ১০ সদস্যের মধ্যে ৭ জনই। তবে একজন সদস্য তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেন।

তাকসিম এ খানের নিয়োগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ওয়াসার বোর্ড সদস্য ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শাবান মাহমুদ দাবি করেন, ওয়াসার পানি আগের চেয়ে মানসম্মত। এ ছাড়া এখন পানির সংকট নেই, সিস্টেম লসও কমেছে। তা ছাড়া এমডি পদে তাকসিম এ খানের ১১ বছরের অভিজ্ঞতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এমডি হিসেবে তাকসিম এ খানের নিয়োগ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে একটি রিট হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সুপেয় পানির দাবি ও বাস্তবতা

বোর্ড সভার কার্যপত্র অনুযায়ী, ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হাসান তাঁর প্রস্তাবের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেন, ২০১৭ সালে (পঞ্চমবার দায়িত্ব নেওয়ার পর) তাকসিম এ খান দায়িত্ব গ্রহণের পর ‘রাজধানীবাসীর চাহিদা অনুযায়ী সুপেয় পানি সরবরাহে’ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

ওয়াসার পানি কতটা সুপেয়, সে সম্পর্কে জানতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, শেওড়াপাড়া, জুরাইন, মিরপুর, কলাবাগানসহ ২০টি এলাকার ৩০ জন গ্রাহকের সঙ্গে গত এক সপ্তাহে কথা বলেছে প্রথম আলো। কিন্তু এমন একজনকেও পাওয়া যায়নি, যিনি মনে করেন ওয়াসার পানি সুপেয়।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা ওয়াসা যে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
ইফতেখারুজ্জামান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক

পশ্চিম শেওড়াপাড়ার অলি মিয়ার টেকের একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, ওয়াসার পানিতে গন্ধ থাকে। এ পানিকে কোনোভাবেই সুপেয় বলা যায় না। পরিশোধন না করে এ পানি পান করা যায় না।

অবশ্য গত বছরের ২০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে তাকসিম এ খান দাবি করেছিলেন, ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয়। এর দুই দিন পর ওয়াসার পানি কতটা সুপেয় তা দেখাতে এক জগ পানি ও লেবু নিয়ে তাকসিম এ খানকে শরবত খাওয়াতে ওয়াসা কার্যালয়ে এসেছিলেন জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। কিন্তু সেই পানির শরবত ওয়াসার এমডি পান করেননি।

চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি, তবু সংকট

বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা তাকসিম এ খানের সাফল্যগাথায় দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকায় পানির দৈনিক চাহিদা ২৪০ থেকে ২৫০ কোটি লিটার। এর বিপরীতে সংস্থাটি ২৬০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে। অর্থাৎ পানি উদ্বৃত্ত থাকছে।

অথচ ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, এখন সিস্টেম লস ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের ২২ শতাংশ পানি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছায় না। এই হিসাবে দৈনিক ২৬০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করলেও সিস্টেম লস হয় ৫৭ কোটি ২০ লাখ লিটার। অর্থাৎ, গ্রাহক পান ২০২ কোটি ৮০ লাখ লিটার। ফলে পানির চাহিদা দিনে ২৪০ কোটি লিটার হলেও ৩৭ কোটি ২০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি থাকে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার একজন মানুষের প্রতিদিন অন্তত ১৫০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এখন ৩৭ কোটি ২০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি থাকলে দৈনিক ২৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে পানির সংকটে থাকছে।

কোনো গ্রাহক সংকটে পড়লে ওয়াসার সংশ্লিষ্ট মডস জোন (যেখান থেকে পানি সরবরাহ করা হয়) বা হটলাইনে যোগাযোগ করেন। পরে টাকার বিনিময়ে সেখান থেকে পানি কিনতে হয়। লরি বা ট্রাকে করে এ পানি গ্রাহকের বাড়ি পৌঁছায় ওয়াসা।

২৩ সেপ্টেম্বর সংস্থাটির মডস জোন-৩ (লালমাটিয়া), মডস জোন-৪ (মিরপুর) এবং মডস জোন-৫ (মহাখালী)–এ যোগাযোগ করে জানা গেছে, জোন তিনটির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে পানির চাহিদা এসেছে, অর্থাৎ তাঁদের বাসায় পানি নেই। ওই দিন দুপুর পর্যন্ত মডস জোন-৩ থেকে ১৬ গাড়ি এবং মডস জোন-৪ থেকে সন্ধ্যা নাগাদ ৭৮ গাড়ি পানির চাহিদা এসেছে। বিকেল নাগাদ মডস জোন-৫ থেকে ৪৯ গাড়ির পানির চাহিদা এসেছে। এ ছাড়া মডস জোন-৯ ও ৮–এ ওই দিন বিকেল পর্যন্ত ৫৮ জন পানির চাহিদার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া গত রোববার মডস জোন-৩ এ ৩০ গাড়ি পানির চাহিদা এসেছিল। তিন হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি গাড়ির জন্য গ্রাহকের খরচ পড়ে ৪০০ টাকা। ৫ হাজার লিটারের জন্য ব্যয় ৫০০ টাকা। পানির গাড়ির জন্য বকশিশ দিতে হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

রাজস্বের কৃতিত্ব নেওয়া কতটা যৌক্তিক

তাকসিম এ খানের পুনর্নিয়োগ প্রস্তাবের যৌক্তিকতায় সংস্থাটির রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে ওয়াসার বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল ৩০০ কোটি টাকা, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু এ বেশি আয় দেখানোকে শুভংকরের ফাঁকি বলছেন ওয়াসারই কিছু কর্মকর্তা। নাম না প্রকাশের শর্তে তাঁরা বলেন, গত ১১ বছরে আবাসিক খাতে পানির দাম বেড়েছে ২৫১ শতাংশ। আর বাণিজ্যিক খাতে ২০৮ শতাংশ বেড়েছে। পানির দাম বাড়লেও ওয়াসার লাভ সেভাবে বাড়েনি। তাকসিম এ খান দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০০৯ সালে। তখন সংস্থাটির লাভ ছিল প্রায় ৪১ কোটি টাকা। তাঁর দায়িত্বের ১০ বছর পর ২০১৯ সালে লাভ হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। তাই রাজস্ব বাড়ানো নিয়ে তাকসিম এ খানের কৃতিত্বের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ। উল্টো তাঁর ১১ বছরের মেয়াদে পানির দাম বেড়েছে ১২ বার।

পয়োনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতা

সংস্থাটির একমাত্র পয়ঃশোধনাগারটি ১৯৭৭ সালের (পাগলা পয়ঃশোধনাগার)। এ শোধনাগারের আওতায় আছে শহরের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা। এ অংশের বর্জ্যও যথাযথভাবে শোধন হয় না। কিন্তু গ্রাহকদের বিল দিতে হয়।

রাজধানীর পয়োনিষ্কাশন–সুবিধা বাড়াতে ২০১২ সালে ওয়াসা একটি মহাপরিকল্পনা করে। এর আওতায় নেওয়া একটি প্রকল্প পাস হয় ২০১৫ সালে। ২০১৯ সালে এ প্রকল্প শেষ করার কথা। অথচ গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ।

অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে সংস্থাটির ব্যর্থতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হয়। জলাবদ্ধতার ব্যর্থতার দায় এখন আর নিজের কাঁধে রাখতে চান না তাকসিম এ খান। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে তিনি এ দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করতে চেয়েছেন।

বিদেশি বিনিয়োগ না ঋণের বোঝা

তাকসিম এ খানের নিয়োগসংক্রান্ত বোর্ড সভায় তুলে ধরা সাফল্যগাথার মধ্যে একটি ছিল বিদেশি বিনিয়োগ। সভায় জানানো হয়, ২০০৮ সালে ঢাকা ওয়াসায় বিদেশি বিনিয়োগ ছিল না বললেই চলে। তাকসিম এ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

তবে এমন বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ঢাকা ওয়াসার একটি অংশ। তাঁরা বলছেন, এ বিনিয়োগ মূলত সুদযুক্ত ঋণ। সুদে-আসলে এ টাকা ওয়াসার গ্রাহকদেরই শোধ করতে হবে।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগে ঢাকা ওয়াসার পাঠানো একটি চিঠি অনুযায়ী, পানির মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের বোঝার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা ওয়াসা যে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বোর্ড সভায় তাঁর সফলতার যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো উপস্থাপনকারীর ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে। তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় বোর্ড সভা হয়েছে, তাতে ত্রুটি রয়েছে। বোর্ড সভার বেশির ভাগ সদস্য তাকসিম এ খানের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে তাঁকে পুনর্নিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন।

মন্তব্য পড়ুন 0