default-image

আলেয়া ফেরদৌসী ব্র্যাকের একজন স্বাস্থ্যকর্মী। মূলত প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াই তাঁর কাজ। কিন্তু গত মার্চ মাসে যখন বাংলাদেশে করোনাভাইরাস হানা দেয়, তাঁর কাজের ধরন পাল্টে যায়, পরিধিও বেড়ে যায়। সেবাদান কার্যক্রম কেবল প্রসূতি মায়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, করোনা রোগী ও তাঁদের পরিবারের সেবাও তাঁকে করতে হয়।

এপ্রিল মাস থেকেই, বিশেষত ঢাকায় করোনা রোগী বাড়তে থাকে। অথচ মানুষ তখনও সতর্কতার নিয়মগুলো মানছেন না। সামান্য উপসর্গ নিয়ে অনেকে টেরও পাচ্ছেন না, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। বিশেষ করে রিকশা–ভ্যানচালক, ফেরিওয়ালা, চটপটি বিক্রেতা—এ ধরনের লোকজন জ্বর-কাশি, গলাব্যথা হলেও তাকে পাত্তা না দিয়ে জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছেন। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তদের অনেকেও যথাযথ সতর্ক হচ্ছেন না। এভাবেই একজনের রোগ ছড়িয়ে যাচ্ছে ১০ জনের মধ্যে। তখনই আলেয়ার প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক চিন্তা করল এই সংক্রমণের রাশ টেনে ধরতে হবে।

বিজ্ঞাপন

করোনা রোগীদের সেবা-সহায়তা এবং এই মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে ব্র্যাক জুলাই মাসে গঠন করল কমিউনিটি সাপোর্ট টিম (সিএসটি)। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৪টি ওয়ার্ডেই যাঁরা করোনার উপসর্গ নিয়ে আছেন, তাঁদের সেবা-সহায়তায় নিয়োজিত এই দলের ৫৮১ জন সদস্য। আলেয়াকেও এই দলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি দায়িত্ব পালন করেন পল্লবী এলাকায়।

এলাকার যেকোনো মানুষের কারও ৯৯ দশমিক ৫-এর বেশি জ্বর, কাশি বা গলাব্যথা থাকলে প্রথমেই তাঁকে পরিবারে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন বা আলাদা রাখার ব্যবস্থা করেন সিএসটির সদস্যরা। ওই পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বাথরুম পরিষ্কার রাখাসহ সম্ভাব্য সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করার দায়িত্ব পালন করে এই দল।

দুজন করে কর্মী একসঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেন। নিজেদের সতর্কতা হিসেবে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস পরেন। সঙ্গে থাকে থার্মোমিটার, অক্সিমিটার, স্যানিটাইজার। এ ছাড়া হেক্সিসল বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার। তাঁদের কাজের কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই। মাঝেমধ্যে রাতেও ফোন আসে, ছুটে যান রোগীর সেবায়। কখনোবা ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়।

আলেয়া জানান, উপার্জনকারী ব্যক্তিটি যখন কোয়ারেন্টিনে থাকেন, তখন পুরো পরিবারেই খাদ্যসহায়তার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই ব্র্যাকের পক্ষ থেকে সিএসটির কর্মীরা তাদের খাদ্যসহায়তা দেন। দুই দফায় (প্রতিবার এক সপ্তাহের) ১৪ দিনের জন্য এই খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ১৭০টি পরিবারকে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে এই খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিদিন রোগীর অবস্থার খোঁজখবর নেন সিএসটির কর্মীরা। প্রয়োজনে ব্র্যাকের টেলিমেডিসিন টিমের পরামর্শমতো ৭–১০ দিনের ওষুধ দেওয়া হয়। অক্সিজেন লেভেল ৯৮-এর নিচে নেমে গেলে রোগীকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তিতেও সহায়তা করছেন তাঁরা।

আলেয়া জানান, প্রথম দিকে এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনায় সতর্কতার লিফলেট, পোস্টার বিতরণের সময় অনেকে ভয় পেতেন, সেবা নিতে চাইতেন না। অনেকেই ভাবতেন, সাহায্যের নামে রোগী চিহ্নিত করে পরে তাঁদের এলাকা থেকে তাড়িয়ে অন্য কোথাও আটকে রাখা হবে। কিন্তু নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে সিএসটির কর্মীরা এখন এলাকাবাসীর আপনজন হয়ে উঠেছেন। এখন বিভিন্ন মহল্লা থেকে অনেকেই ফোন করে তাঁদের সমস্যার কথা জানান, পরামর্শ চান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন