বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ব্যতিক্রমী এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বিডি ক্লিন নামের একটি সংগঠন। এর আগে ২০১৯ সালে একই স্থানে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক বোঝাতে অন্য রকম এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল সংগঠনটি। তখন ৩০ লাখ প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

default-image

শুক্রবার দুপুরে টিঅ্যান্ডটি স্কুল মাঠের ফটকে গিয়ে দেখা যায়, সিগারেটের খালি প্যাকেট দিয়ে তৈরি করা ওই ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই ছবি ও সেলফি তুলছিলেন। সিগারেটের খালি প্যাকেট দিয়ে তৈরি ফটকে রাজা ও রানির অবয়বে চারটি চিত্র আঁকা হয়েছে। আয়োজকেরা জানান, পৃথিবীতে সিগারেট কোম্পানিগুলোর একক রাজত্ব বোঝাতেই ফটকে ছবি সাঁটানো হয়েছে। এসব ছবি আবার আঁকা হয়েছে সিগারেটের ফিল্টার দিয়েই।

ভেতরে প্রবেশের পর ফিল্টার দিয়ে ফুটিয়ে তোলা বিভিন্ন বিষয়ের অবয়বের প্রদর্শনী দেখে যে কেউ থমকে যেতে পারেন। যত্রতত্র সিগারেটের ফিল্টার ফেলে রাখলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, তা শিল্পীদের নান্দনিক উপস্থাপনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে ডান পাশে চোখে পড়ে একটি ক্যানভাস, যেখানে রয়েছে ফিল্টারে বানানো ফুসফুসের অবয়ব। পাশেই ফিল্টার দিয়ে লেখা হয়েছে—সচেতন হওয়ার এখনই সময়, সচেতন হও মানুষ, ধূমপানে হয় ধীর ক্ষতি, নষ্ট করে ফুসফুস।

default-image

এরপর ক্যানভাসে রয়েছে ফিল্টার দিয়ে তৈরি করা গাছের চিত্র। গাছটির একদিকের পাতা ঝরে গেছে। পাশে লেখা হয়েছে—যত্রতত্র ফেলা দেওয়া সিগারেটের বাঁট ধ্বংস করে উর্বরতা, উজাড় করে গাছ। এর পরের ক্যানভাসে রয়েছে ফলমূলের চিত্র। সেখানে ফিল্টার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আম, কলা ও পেঁপের অবয়ব। পাশেই লেখা হয়েছে—সিগারেটের ফিল্টার মাটিতে ফেলে করবেন না ভুল, পুষ্টিগুণ সব হারিয়ে হচ্ছে বিষাক্ত ফলমূল।

কেবল ভূ–উপরিভাগেই নয়, ফিল্টার গিয়ে পড়ছে পানিতেও। এর প্রভাব পড়ছে প্রাণিকুলের ওপর। এটা বোঝাতে প্রদর্শনীতে কচ্ছপের একটি অবয়ব তৈরি করা হয়েছে ফিল্টার দিয়েই। সচেতনতা বাড়াতে সেখানে লেখা হয়েছে—সিগারেটের ফিল্টার জলাভূমির জন্য ক্ষতিকর, অসচেতনতায় পস্তাতে হবে সারা জীবনভর। এরপরে দেখা যায় ফিল্টার দিয়ে তৈরি করা মাছের অবয়ব। জলজ প্রাণীর ক্ষতির বিষয়টি বোঝাতে সেখানে লেখা হয়েছে—যত্রতত্র ফেলা ফিল্টার, দূষণের বড় অংশ—পানিতে মিশে ধ্বংস করছে মাছের বংশ।

প্রদর্শনী থেকে বেরোনোর পথে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের একটি প্রতিকৃতি। আয়োজকেরা বলছেন, জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব থাকায় যারা ধূমপান করেন না, তাদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। এটা স্মরণ করিয়ে দিতেই এই চিত্র তৈরি করা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে—বাঁচতে হবে বাংলাদেশে, বাঁচতে হবে নিজেকে, ফিল্টারে জমে থাকা বিষ, ক্ষতি করে মস্তিষ্কে।

প্রদর্শনীতে মাঠের উত্তর দিকে প্লাস্টিক বোতলের ছিপি ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিকৃতির প্রস্থ ১০০ ফুট আর দৈর্ঘ্য ৫০ ফুট। বিশাল প্রতিকৃতি তৈরির ব্যাখ্যায় আয়োজকেরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী তথা ১০০ বছর এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছর পূর্তির বিষয়টি মাথায় রেখে এটা করা হয়েছে।
টিঅ্যান্ডটি মাঠে সিগারেটের ফিল্টার দিয়েই বিশাল আকৃতির একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় আয়োজকেরা বলছেন, গোটা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশের আনাচ–কানাচে সিগারেটের ফিল্টার ফেলে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে। দেশের সব জেলায় অব্যাহতভাবে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে—এমনটা বোঝাতেই ফিল্টার দিয়ে মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে।

default-image

ঘণ্টা দেড়েক সেখানে অবস্থান করে দেখা গেল, এই আয়োজন দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এসে জড়ো হচ্ছেন। অনেকেই এসব প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ তুলছেন সেলফি।

মিরপুরের কালশী রোড এলাকা থেকে প্রদর্শনী দেখতে আসা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ফিল্টার যে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এত ক্ষতিকর, তা এখানে না এলে বুঝতেন না।

আয়োজক সংগঠন বিডি ক্লিনের প্রতিষ্ঠাতা ফরিদ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সিগারেটের একটি ফিল্টার মাটির সঙ্গে মিশে যেতে সময় লাগে ১২ থেকে ৮৬ বছর। প্রদর্শনীর সব কারুকাজ তৈরি করেছেন বিডি ক্লিনের ৪০০ সদস্য। এসব তৈরি করতে সময় লেগেছে ১৬ দিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী ফরিদ বলেন, ‘আমরা কাউকে ধূমপান ছাড়তে বলছি না। আমরা যত্রতত্র যাতে ফিল্টার ফেলা না হয়, এটা বলছি। এর জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে উন্নত দেশের মতো ধূমপান করার জায়গা (স্মোকিং জোন) তৈরি করে দিতে হবে। এটা করা গেলে সেখান থেকে ফিল্টার সংগ্রহের পর এটাকে রিসাইকেল করে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।’

default-image

সিগারেটের ফিল্টারের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে গিয়ে আয়োজক সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বলছেন, পৃথিবীতে সর্বাধিক পাওয়া বর্জ্য হচ্ছে সিগারেটের ফিল্টার। বৈশ্বিক পরিবেশের পাশাপাশি মানবস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী বর্জ্যের বেশির ভাগ অংশ হচ্ছে এই পরিত্যক্ত ফিল্টার। প্রতিবছর ৬০ মিলিয়নের বেশি ফিল্টার পরিবেশে ফেলা হয়। বছরে বাংলাদেশে ৪৯ বিলিয়ন সিগারেট খাওয়া হয়।

আয়োজক সংগঠনের সদস্যরা জানান, পানিদূষণের অন্যতম উৎস সিগারেটের ফিল্টার। একটি সিগারেটের ফিল্টার ৮ লিটার পানি দূষিত করে। সিগারেটের ফিল্টার মাটির উর্বরতা শক্তি ১০ থেকে ২৭ শতাংশ কমিয়ে দেয়। ফিল্টারের ক্ষতিকর এমন চিত্র বিবেচনায় যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন