বিজ্ঞাপন

পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, সরকারে যে-ই থাকুক, তাকে অন্ধভাবে দেশ চালাতে দেওয়া যাবে না। লোভের কারণে ইতিহাস মুছে যাবে, তা হতে দেওয়া যাবে না। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ধ্বংস হলে বঙ্গবন্ধু, জাহানারা ইমামসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংস হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সোচ্চার নাগরিক আন্দোলন জারি রেখে প্রকৃতি ও পরিবেশবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ধ্বংস হলে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে যাবে, জাহানারা ইমামের নাম মুছে যাবে এবং যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছে, সেটা মুছে যাবে। আমরা একটা নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা পেয়েছি, সেটা মুছে যাবে। এটা হতে দেওয়া যাবে না। যার জন্য এ আন্দোলন জারি রাখতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

খুশী কবির বলেন, ‘একটি দেশের কমপক্ষে যে পরিমাণ গাছ থাকা দরকার, সেটা আমাদের দেশে নাই। সরকারিভাবে ১৬ শতাংশের বেশি বলা হচ্ছে। কিন্তু তা আসলে নেই। মধুপুর গড়ের গাছ কেটে একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস লাগিয়ে এই শালবনকে ধ্বংস করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক জায়গাটি (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) রক্ষা করার জন্য নতুন প্রজন্মকে সোচ্চার হতে হবে। গাছ কাটার মূল উদ্দেশ্যটি হচ্ছে বাণিজ্যিক এবং টাকা বানানো। নানাভাবে পেঁচিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভুল বুঝিয়ে এই প্রকল্পগুলো করা হয়, যার পেছনে কিছু মানুষের স্বার্থ জড়িত।’ এই জায়গাটির গাম্ভীর্য নষ্ট করে বাণিজ্যিক জায়গা না করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া গাছ না কেটে পরিবেশের স্বার্থে ভালো হয়, এমন গাছ লাগানোরও দাবি করেন এ মানবাধিকার কর্মী।

স্থপতি ও নগর-পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, গাছ কেটে সাফ করে উদ্যানে ‘উন্নয়ন’ দাঁড় করানো হচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এ বিষয়টির পেছনে তিনটি মন্ত্রণালয় রয়েছে—গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর পেছনে কার হাত রয়েছে?
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর গাছ কাটা বিষয়ে বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইকবাল হাবিব বলেন, তাঁর দুঃখ জেনে কী করব? উদ্যান, গাছ ও অন্যান্য পরিবেশবিষয়ক বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য একটা কমিশন গঠন করতে হবে, যার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়।

গাছ কাটার বিরুদ্ধে রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, উদ্যানের কোনো ক্যারেক্টার পরিবর্তন করা যাবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেহেতু ডিকলার্ড উদ্যান, তাই আইনের মাধ্যমে এই উদ্যান সুরক্ষিত। এখানকার যে কোনো বৃক্ষরাজির নিধনকেও শ্রেণি পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করা হবে। গাছ যদি কাটা হয়, তাহলে উদ্যান ধ্বংস হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও আইনে বলা আছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য স্থাপনা হলে ঐতিহাসিক স্মৃতিকে বুঝতে পারা যাবে না বলেও মনে করেন তিনি।

আলোচনায় শামসুল হুদা বলেন, একটা বৈশ্বিক মহামারির সংকট চলছে এবং সে মহামারি এসেছে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। সেখান থেকে আমরা মনে হয় কিছুই শিখলাম না। প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে ধারাবাহিক কার্যক্রম চলছে, তারই একটা অংশ এটা। আমলা, প্রশাসনের মধ্যেও এমন একটা প্রবণতা আছে। এটা হলো গাছ, প্রকৃতি, বন, জলাধার ধ্বংস করে ‘উন্নয়ন’ কাজ পরিচালনা করা। পরিকল্পনা গ্রহণ করে সারা দেশব্যাপী পরিবেশ রক্ষার যে আন্দোলনগুলো চলছে, সে আন্দোলনগুলোকে সমন্বিত করারও আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আকসাদুল আলম বলেন, প্রকৃতিকে যে রক্ষা করতে হবে, তার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের যে রাজনীতি, সেটাকে আমরা কতটুকু সামনে আনি? একটা জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তা ছাড়া পরিবেশকে সামনে এনে রেসকোর্স বাদ দিয়ে উদ্যান হওয়া এবং শিশু পার্ক স্থাপন, এসবের পেছনে যে রাজনীতি, এগুলো সামনে নিয়ে আসা জরুরি। পরিবেশ ও উদ্যান রক্ষার আন্দোলনকে জনগণের সামনে নয়ে যেতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘আমরা যে সময় এই গাছ কাটার মহোৎসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি সেই সময় পুরো পৃথিবীজুড়ে অক্সিজেনের জন্য লড়াই করছি। সুন্দরবন ধ্বংস, ওসমানী উদ্যান, মধুপুরের শালবন ধ্বংস ও পাহাড়ে বন ধ্বংস করে হোটেল নির্মাণ—এসব একই সূত্রে গাঁথা।’ তিনি বলেন, পুঁজিবাদের মহা সম্প্রসারণ, তার পেছনের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের চক্রান্তের কারণে গাছ কেটে, বন কেটে, উদ্যানকে বাণিজ্যিক জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই কাজগুলোর পেছনে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উদাসীনতা এবং করপোরেটদের স্বার্থ জড়িত। বাংলাদেশ এখন বিশাল আমলা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন