default-image

দিলীপ দাশ ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে জুতা সারাইয়ের কাজ করেন। একসময়ের গাড়িচালক যাত্রাবাড়ীর কলাপট্টি লেনের বাসিন্দা শংকর লাল ঘোষ এখন পুরোপুরি বেকার। বাংলা একাডেমিতে ছোট চাকরি করেন বেলী রানী। গত ৫০ বছরে তাঁদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি কিংবা তাঁদের নিহত স্বজনেরা পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এই মানুষগুলো। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন মন্দির রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে পাকিস্তানি সেনারা ঢুকে ভয়াবহ এক গণহত্যায় মেতে উঠেছিল। ৮৫ থেকে ১০০ জনকে হত্যা করা হয় ওই মন্দির ও আশ্রমে। আশ্রমে পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ বেলা ১১টায়, আর হত্যাযজ্ঞ চলে ২৬ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত।

ওই রাতে ছোট দুটি বোন মিতা ও গীতা আর বাবা গণেশ মুচিকে হারান দিলীপ দাশ। শংকর লাল ঘোষ হারিয়েছেন ঠাকুরদা ধীরেন ঘোষকে। স্বামী সরযু দাশসহ পরিবারের তিনজনকে হত্যা করা হয় বেলী রানী চোখের সামনে। বড় ভাই ত্রিদিব কুমার রায় ও নানা বাদল চন্দ্র রায়কে হারান বাংলা একাডেমির চুক্তিভিত্তিক চাকুরে বিপুল রায়।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে রমনা কালীমন্দিরে যাঁরা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাঁদের ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’র স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছেন স্বজনেরা। মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের অনেকের ভাষ্য, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা না হলেও শহীদের স্বীকৃতি তাঁদের পাওয়া উচিত। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিন বছর আগে ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় বিশেষ প্রতিবেদন ‘ভুলে যাওয়া সেই গণহত্যা’। ওই প্রতিবেদনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, ‘রমনা কালীমন্দির ও আশ্রমে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁরা “গণশহীদ”। তাঁদের পরিবার স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করলে আমরা বিষয়টি প্রক্রিয়ার মধ্যে নেব।’

প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই বছরের ২০ মে রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রমের ‘১৯৭১ সালের ক্ষতিগ্রস্ত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার পুনর্বাসন কমিটি’র পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে গণহত্যায় নিহত শহীদদের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। এরপর ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিপুল রায় সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু গত তিন বছরে মন্ত্রণালয় থেকে আমরা কোনো ধরনের সাড়া পাইনি।’ তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘সামান্য একটু স্বীকৃতি কি আমরা পেতে পারি না?’

সংগঠনের নেতারা বলছেন, গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা বেশির ভাগই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে তাঁদের এককালীন দুই হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এরপর তাঁরা আর তেমন সহায়তা পাননি।

মন্দির ও আশ্রমে নিহতের সংখ্যা নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, নিহতের সংখ্যা শতাধিক। কারও মতে, সংখ্যাটি ৮৫ থেকে ১০০। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য ২০০০ সালে গঠিত ‘রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ গণতদন্ত কমিশন’ বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ৫০টি নাম পেয়েছে। আবার মন্দিরের সামনে সংগঠনের উদ্যোগে নির্মিত স্মৃতিফলকে আছে ৬১ জনের নাম।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও লেখক শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে যেসব জায়গায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেখানে জমি অধিগ্রহণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আছে। তা ছাড়া এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায়ও আছে। রমনা কালীমন্দিরে নিহত ব্যক্তিদের শহীদের মর্যাদা পেতে কোনো বাধা থাকার কথা নয় বলে তাঁর অভিমত।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন