রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ভেতরে অবৈধভাবে বসেছে দোকানপাট। গতকাল সকালে
রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ভেতরে অবৈধভাবে বসেছে দোকানপাট। গতকাল সকালে ছবি: আশরাফুল আলম

দেশে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে। শুধু রাজধানীর মানুষ নয়, সারা দেশের মানুষ এই হাসপাতালে হৃদ্‌রোগের সাধারণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসা ব্যয় কম হওয়ায় দরিদ্র বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের ভিড় হাসপাতালটিতে বেশি লক্ষ করা যায়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার এখানে বিনা মূল্যে হয়।

গতকাল সোমবার সকালে প্রধান ফটক দিয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল চত্বরে ঢুকতেই হাতের ডানে ডাবভর্তি ভ্যান চোখে পড়ে, পাশেই মুড়ি-চানাচুর বিক্রেতা। নাম জিজ্ঞাসা করতেই ডাব বিক্রেতা বললেন, ‘নাম দিয়ে কী কাম, ডাব খাইলে খান।’ ভিড় থাকায় মুড়ি-চানাচুর বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

শুধু এই দুটি দোকান নয়, হাসপাতাল চত্বরে দোকান আরও আছে। হাসপাতালের দক্ষিণ দিকে গেলে বোঝার উপায় নেই, এটি বিশেষায়িত হাসপাতালের চত্বর, নাকি বাজার। গুনে দেখা গেছে, দেয়াল ঘেঁষে পরপর ২৪টি দোকান এক জায়গায়। এ ছাড়া আছে হরেক পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসা ফেরিওয়ালা।

হাসপাতালের দক্ষিণ দিকে গেলে বোঝার উপায় নেই, এটি বিশেষায়িত হাসপাতালের চত্বর, নাকি বাজার। শেরেবাংলা নগরে আরও কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ রকম বাজার দেখা যায় না।
বিজ্ঞাপন

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাসপাতালের পরিচালক মীর জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালের সীমানার মধ্যে এতগুলো দোকান থাকা অশোভন দৃশ্য, জানি। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় একাধিকবার দোকান তুলে দিয়েছি। মন্ত্রীদের জানিয়েছি। কাজ হয় না। উচ্ছেদের দুদিন পর আবার দোকান বসে যায়।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম মাঝেমধ্যেই হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। গত মাসেও তিনি ওই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আমরা প্রতিটি হাসপাতালকে নির্দেশনা দিয়েছি। চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়েছি। এরপর আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব।’

মূল হাসপাতাল ভবনের সামনের রাস্তায় বেলা ১১টায় ব্যাগ বিক্রি শুরু করেন পটুয়াখালীর বাউফলের শহীদুল ইসলাম। শহীদুল বললেন, ‘কোনো মার্কেটে এখন আর জায়গা হয় না। তাই হাসপাতালে বসেছি।’ তিনি নিউমার্কেট এলাকায় থাকেন। প্রতিদিন একই সময় ব্যাগ নিয়ে আসেন, থাকেন সন্ধ্যা পর্যন্ত। ব্যাগের দোকান বসানোর জন্য কারও অনুমতির দরকার হয়েছে? শহীদুল বললেন ‘না’। কাউকে চাঁদা দিতে হয়? তিনি বলেন, ‘টাকা চায়, আমি দেই না।’

হাসপাতালের সীমানার মধ্যে এতগুলো দোকান থাকা অশোভন দৃশ্য, জানি। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় একাধিকবার দোকান তুলে দিয়েছি। মন্ত্রীদের জানিয়েছি। কাজ হয় না। উচ্ছেদের দুদিন পর আবার দোকান বসে যায়।
মীর জামাল উদ্দিন, হাসপাতালের পরিচালক

শহীদুলের পাশেই শীতের পোশাক বিক্রি করছেন এক যুবক। প্রতিটি জ্যাকেটের দাম হেঁকেছেন ১ হাজার ১০০ টাকা। রাস্তার উল্টো দিকে গরম ডিম বিক্রি করছেন এক নারী। পাশেই সিগারেটের দোকান। কাছেই বসে ছোলা-বুট-বাদাম বিক্রি করছে এক কিশোর।

এদের রেখে দক্ষিণ দিকে এগোলেই সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে একের পর এক দোকান। এসব দোকানে পানি, বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় বা ড্রিঙ্কস যেমন আছে, তেমনি আছে পাউরুটি, বিস্কুট, টোস্ট, কেক, চকলেট। দোকানে প্লাস্টিকের মাদুর, লেপ, তোশক, কম্বল, বালিশ, গামছা যেমন দেখা গেছে, সঙ্গে দেখা গেছে মগ, বালতি, গামলা, কাপ, প্লেট, গ্লাস। টুথপেস্ট, ব্রাশ, আয়না, চিরুনি, তেল, ক্রিমসহ নানা প্রসাধনও দোকানগুলোতে দেখা গেছে। আছে প্লাস্টিকের টুল, জুতা। আর আছে নানা ধরনের ফল।

হাসপাতালের সীমানার মধ্যে দোকান দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এক দোকানি বলেন, ‘দোকান দিলে সমস্যা কী। রোগীর মানুষেরই তো লাভ।’ পুলিশ উঠিয়ে দেয় না? এর উত্তরে ওই দোকানি বলেন, ‘হাতে–পায়ে ধরে থাকি।’

হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আমরা প্রতিটি হাসপাতালকে নির্দেশনা দিয়েছি। চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়েছি। এরপর আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব।
আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক
বিজ্ঞাপন

৪৫০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে এক হাজারের মতো। গতকাল বিভিন্ন তলায় গিয়ে দেখা গেছে, বারান্দায় বা করিডরে রেখে রোগীর চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালের একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক গতকাল প্রথম আলোকে বলেছেন, দোকানের কারণে হাসপাতালের পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে।

শেরেবাংলা নগরে আরও কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি—সরকারি এই প্রতিষ্ঠানগুলো কাছাকাছি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ রকম বাজার দেখা যায় না। দু-একটি দোকান আছে ঢাকা শিশু হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল)।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালের পরিবেশ নির্জন হতে হবে, পরিষ্কার হতে হবে। দোকান নির্জনতার জন্য হুমকি। দোকানের বর্জ্য হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করে।

পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক তৌফিক জোয়ারদার প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের সীমানায় এমন কিছু করা উচিত নয়, যা চিকিৎসাসেবা বা রোগীর স্বার্থের পরিপন্থী হয়।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন