প্রতিবন্ধীদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স
১০ বছরে অনুমোদন, মূল কাজের জন্য আরও অপেক্ষা
আজ শুক্রবার আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হবে। এ উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রতিবন্ধীদের জন্য খেলাধুলা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য একটি আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের আলোচনা শুরু হয় ২০১১ সালে। এ লক্ষ্যে ২০১২ সালে সাভারের দক্ষিণ রামচন্দ্র ও রারইগ্রাম মৌজায় ১২ একর জমি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১০ বছর পেরিয়ে এ বছর প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরিকল্পনা ও অনুমোদনে ১০ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পর সবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মূল কাজ বা নির্মাণে যেতে এখনও অনেক দেরি।
সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দেখে এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া, ২০২১–২২ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত না হওয়া এবং বন্দোবস্ত জমি এখনো বুঝে না পাওয়ায় মূল কাজে যেতে অপেক্ষার সময় আরও বাড়াতে হবে। গত ২১ নভেম্বর প্রকল্প কোড বরাদ্দ, সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির সফটওয়্যারে (আইবাস প্লাস প্লাস) প্রকল্পসংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রবেশ ও অনুমোদনের আইডি কোড দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। একই সময়ে জমি বুঝিয়ে দিতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
তিন বছর মেয়াদের প্রকল্পটির কাজ শুরু হতে দেরি হওয়া প্রসঙ্গে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আনিছুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্প তৈরি করে উপস্থাপন করতে দেরি হয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুততার সঙ্গে কাজটি করেছি। আগে কী হয়েছে জানি না।’
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচি’ অনুসারে, গত ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৪২৪।
প্রকল্প তৈরি করে উপস্থাপন করতে দেরি হয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুততার সঙ্গে কাজটি করেছি। আগে কী হয়েছে জানি না।মো. আনিছুজ্জামান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন
এদিকে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রতিবন্ধীদের জন্য খেলাধুলা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় ৩৫-৪০ জন প্রতিবন্ধী অংশ নিচ্ছেন।
দীর্ঘ সময় পর অনুমোদন: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে ২০১৩ সালের ১ জুলাই ‘প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্সের’ ডিপিপি তৈরির বিষয়ে সভা হয়। ২০১৯ সালে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ রাখার প্রস্তাব করা হয়। সময়ে–সময়ে প্রকল্পের মেয়াদ ও বাজেট পরিবর্তন করে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়। সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ একনেকের সভায় কিছু শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। সময় পেরিয়ে যাওয়ায় পূর্বনির্ধারিত ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন মাসের পরিবর্তে নতুন মেয়াদ নির্ধারণ হয় ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এ বছরের ৭ নভেম্বর প্রেষণে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপসচিব মো. আবদুল্লাহ আল মামুন তালুকদার। তিনি বলেন, অনেক প্রক্রিয়া মেনে একটি কাজ শুরু করতে হয়। প্রত্যেকটি কাজ ও এর ব্যয়ের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক কোড দিতে হবে। জনবল নিয়োগ দিতে হবে। লজিস্টিক সাপোর্ট নেই, সেটিও ঠিক করতে হবে। আর জমির বিষয়টি গণপূর্ত অধিদপ্তর দেখছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সাভার ডিভিশন) আহসান হাবীব বলেন, ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কাছে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। জমি পেলেই নির্মাণকাজ শুরু হবে।
ক্রীড়া কমপ্লেক্সে যা থাকবে: কমপ্লেক্সে ২৭ হাজার ৮১১ বর্গ মিটার আয়তনবিশিষ্ট ১১ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ৬ তলা ডরমিটরি ও হোস্টেল ব্লক নির্মাণ, আবাসিক ব্লক, অ্যাথলেট ট্র্যাকসহ ফুটবল মাঠ, ক্রিকেট মাঠ, সুইমিং পুল, মসজিদ, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, জিমনেসিয়াম, মেডিকেল সেন্টার, মাদার কেয়ার সেন্টার, মুজিব কর্নার, ৩০ আসনের কম্পিউটার ল্যাব ও গ্রন্থাগার থাকবে।
আন্তর্জাতিক মানের প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স রয়েছে এমন অন্তত দুটি দেশে (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জার্মানি, যুক্তরাজ্য) ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের জন্য শিক্ষা সফর বাবদ ১ কোটি টাকা এবং ১৮ জন প্রতিনিধির কারিগরি পরিদর্শনের জন্য ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বাজেট রাখা হয়েছে।
যথাযথ পর্যবেক্ষণ জরুরি: সব ধরনের প্রতিবন্ধীদের বিনা মূল্যে খেলাধুলায় যুক্ত করা এবং দেশে ও বিদেশে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ সহায়তা দিচ্ছে ২০১৬ সালে গঠিত স্পোট৴স ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেন্ডেন্স বাংলাদেশ (শি)। বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে সংগঠনটি সারা দেশ থেকে খেলাধুলায় পারদর্শী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুঁজে এনেছে এবং অনেকে আন্তর্জাতিক পদকও পেয়েছেন।
আজ ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী করে তৈরি সংগঠনের ‘ইনক্লুসিভ স্পোর্টস সেন্টার’–এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খেলাধুলা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন খেলায় অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় ৩৫-৪০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
শি–এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শারমিন ফারহানা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের কথা শোনা যাচ্ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা খেলাধুলায় যুক্ত হলে তাঁদের ভেতরের অনেক হতাশা দূর হয়ে যায়। তাঁরা আনন্দে থাকেন। নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন শ্রেণিগত ভাগ করে, তাঁদের আগ্রহ অনুযায়ী খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে হয়। তাই তাঁদের জন্য একটি বিশেষায়িত ক্রীড়া কমপ্লেক্সের প্রয়োজন। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত কল্যাণে যেন তা ব্যবহার হয়, সে জন্য এর আর্থিক ব্যবস্থাপনা যথাযথ পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।