বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও যতীন এণ্ড কোং আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। ১১১ বছর ধরে হারমোনিয়ামসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি। ৫০ বছর আগে মারা যান যতীন্দ্র মোহন মণ্ডল। তবে বাবার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটি দেখভাল করে চলেছেন তাঁর ছেলে সুনীল কুমার মণ্ডল। প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে সুনীলকে।

সুনীল কুমার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাবতে আমার ভালো লাগে, বাবার হাতের গড়া প্রতিষ্ঠানটি আমি টিকিয়ে রাখছি স্বমহিমায়। এখনো হারমোনিয়াম বলতে বোঝায় যতীন এণ্ড কোং। হারমোনিয়ামের মানের সঙ্গে বাবা কখনো আপস করেননি, আমিও করি না। যতীন এণ্ড কোংয়ের হারমোনিয়ামের দাম একটু বেশি, কিন্তু মানে অনন্য। যতীনের হারমোনিয়ামের সঙ্গে অন্য হারমোনিয়ামের পার্থক্য যুগ যুগ ধরে। বাবাও হারমোনিয়াম তৈরির উপকরণ বাইরে থেকে আনতেন, আমিও সেটাই করি।’

default-image

ঘুরে দাঁড়ানো

যতীন্দ্র মোহনের হারমোনিয়ামের প্রথম দোকান ছিল পুরান ঢাকার অশোক জমাদার লেনে। সেখানে তিনি স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। তবে হারমোনিয়াম তৈরির কারখানা ছিল কেরানীগঞ্জের নিজের গ্রামের বাড়িতে। কয়েক বছর পর দোকানটি ইসলামপুরের তৎকালীন লায়ন সিনেমা হলের পাশে নেন। আবার দোকানটি নিয়ে আসেন পাটুয়াটুলীতে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হয়ে যতীন এণ্ড কোং নব্বই দশক পর্যন্ত সেখানেই টিকে ছিল। যতীন মারা যান ১৯৭০ সালে। এরপর ছেলে সুনীল ব্যবসার হাল ধরেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় সপরিবারে সুনীল চলে যান ভারতে। দেশ স্বাধীনের পর ফিরে এসে পাটুয়াটুলীর দোকানটি আবার চালু করেন।

হারমোনিয়াম, সেতার, তানপুরাসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করে ভালোই চলছিল সুনীলের দিন। তবে ১৯৯০ সালে জীবনের কঠিন সময় আসে। তখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় একরাতে যতীন এণ্ড কোং পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। তখন মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছিলেন সুনীল। পরে ধারদেনা করে আবার ঘুরে দাঁড়ান। দোকান নিয়ে চলে আসেন শাঁখারীবাজারে। সেখানে টিকে আছে যতীন এণ্ড কোং।

সুনীল কুমার মণ্ডল পাটুয়াটুলীতে দোকান পুড়িয়ে দেওয়ার কথা ভুলতে পারেন না। বারবার ঘুরেফিরে আসে সেই দুঃসহ স্মৃতি। আর সেসব দিনের কথা মনে পড়লে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন তিনি। তখন মনে জন্ম নেয় ক্ষোভ আর হতাশা। তবুও সুনীল বড় আশাবাদী মানুষ। স্বপ্ন দেখেন, ঘরে ঘরে সংগীতচর্চা হচ্ছে। সুনীল মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন কবিতা, গান, সংগীত মানুষকে পরিশীলিত করে।

সুনীল সব সময় বাবা যতীন্দ্র মোহন মণ্ডলকে স্মরণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন সংগীতের বড় একজন সমঝদার। সংগীতের তখনকার যাঁরা দিকপাল, তাঁদের সবার সঙ্গে সখ্য ছিল যতীন্দ্রের। তাঁর দোকানে জলসা হতো।

‘হেকীম হাবীবুর রাহমানের ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে’ গ্রন্থে রয়েছে সেই স্মৃতিচারণ। সেখানে বলা আছে, ‘এমন একসময় ছিল, যখন যতীন বাবুর দোকানে নিয়মিত শনি ও মঙ্গলবার গানের জলসার আয়োজন হতো। এ গানের জলসায় ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খাঁ, কাজী মোতাহের হোসেন, প্রসন্ন বণিক, ভগবান চন্দ, সেতারী থেকে শুরু করে সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যোগ দিতেন। সমঝদার সংগীতজ্ঞ হিসেবে যতীন বাবু ঢাকার নবাববাড়ি, রূপলাল হাউস, গৌরীপুর, মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি, ত্রিপুরার রাজদরবারে সংগীত পরিবেশন করতেন।’

default-image

শাঁখারীবাজারের যতীন এণ্ড কোং

পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন শাঁখারীবাজারের ছোট্ট গলিতে যতীন এণ্ড কোংয়ের সাইনবোর্ডটি যে কারও চোখে পড়বে। পুরোনো ভবনের নিচতলায় যতীন এণ্ড কোং। দোকানটিতে থরে থরে সাজানো হারমোনিয়াম, বেহালা, তবলা, তানপুরা, গিটারসহ নানা প্রকারের বাদ্যযন্ত্র। সাত হাজার থেকে দশ হাজার টাকা দামের হারমোনিয়ামগুলো বেশি চলে। তবে দোকানে ২৫ হাজার টাকা দামেরও হারমোনিয়াম রয়েছে। দোকানের পেছনেই হারমোনিয়াম তৈরির কারখানা। ভোরের আলো ফোটার পর হারমোনিয়াম তৈরির কাজ শুরু হয়, চলে সন্ধ্যা অবধি।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন