আবদুল্লাহর বয়স মাত্র ২০ দিন। খিদে পেলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করে। খাবার দিলে খেয়ে ঘুমায়। সে বলতে গেলে এখন সুস্থ। তবে তার পেটের ওপর জোড়া লাগানো আরেকটি অপূর্ণাঙ্গ শিশু। এ শিশুর দুই পা, দুই হাত, শরীরের পেছনের অংশ, পায়খানা-প্রস্রাবের রাস্তা থাকলেও মাথা, মস্তিষ্ক ও বুকের অংশ নেই। এই অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি বড় হচ্ছে আবদুল্লাহর শরীর থেকে পুষ্টি নিয়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের শিশুকে ‘কনজেনিটাল প্যারাসাইটিক টুইন’ বা জোড়া অপূর্ণাঙ্গ যমজ বলা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় আবদুল্লাহ ঘুমাচ্ছে। তবে চিকিৎসক তাকে একটু নাড়া দিতেই খেপে গেল। জেগেই শুরু করল চিৎকার। দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্স জানালেন, আবদুল্লাহ একটি সুস্থ বাচ্চার মতোই সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করে। অন্যদিকে অপূর্ণাঙ্গ শিশু আবদুল্লাহর শরীর থেকে পুষ্টি নিয়ে বেঁচে আছে।

আবদুল্লাহর জন্মের পর দুই দিনের মাথায় নোয়াখালী থেকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে ভর্তি আছে হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে। এত দিন আবদুল্লাহর বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা আগামী রোববার অস্ত্রোপচার করে আবদুল্লাহ শরীরের সঙ্গে লাগানো যে মাংসপিণ্ড, তা অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আবদুল্লাহর মায়ের নাম পারভীন। বাবার নাম সালাউদ্দিন। সালাউদ্দিন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে আছেন। এ দম্পতির এটিই প্রথম সন্তান। হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথেই প্রসবব্যথায় পারভীনকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা হয়। ছেলে আবদুল্লাহর অস্ত্রোপচার সম্পর্কে বললেন, চিকিৎসকেরা যা ভালো বুঝবেন, তা–ই করবেন।

default-image

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আশরাফ উল হক বললেন, সন্তানের জন্মপ্রক্রিয়ায় সাধারণত একটি শুক্রাণু ডিম্বাণু নিষিক্ত করে। তবে মাঝেমধ্যে এ প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন না হলে জোড়া লাগানো যমজের একটি আরেকটির ওপর প্রভুত্ব বা ডমিনেট করে। সুস্থ শিশু যার ওপর প্রভুত্ব করে, তার শরীরের কিছু অংশ থাকলেও সে পূর্ণাঙ্গ শিশু হিসেবে জন্ম নিতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত অপূর্ণাঙ্গ শিশুর মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ড থাকে না। এ ধরনের সন্তানের জন্মকে কিছুটা বিরলই বলা চলে। তবে জোড়া লাগানো যমজের অস্ত্রোপচারের সময় দুটি শিশুকেই বাঁচানোর কথা চিন্তা করতে হয়। তবে অপূর্ণাঙ্গ শিশু অস্ত্রোপচার সাধারণত সহজ হয়—এ ক্ষেত্রে সুস্থ বাচ্চাটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। আর অস্ত্রোপচার ছাড়া এর কোনো বিকল্পও নেই। সুস্থ শিশুর কাছ থেকে পুষ্টি নিয়েই অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি বেঁচে থাকে। ফলে সুস্থ শিশুটি আস্তে আস্তে অপুষ্টির শিকার হতে থাকে।

শিশু সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিৎসক অমিতাভ বিশ্বাস বললেন, এ ধরনের অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি আগাছা বা পরজীবীর মতো সে বেঁচে থাকে অন্যের ওপর নির্ভর করে। তিনি জানালেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে আবদুল্লাহর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশ অপূর্ণাঙ্গ শিশুর ভেতরে নেই। কিছু রক্তনালির যোগাযোগ আছে। তবে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি তো আছেই। অস্ত্রোপচার বা এর পরেও যেকোনো জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

এর আগে ২০১৬ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) জোড়া লাগানো অপূর্ণাঙ্গ যমজের অস্ত্রোপচার হয়। ওই বছরের ৭ মার্চ বাগেরহাটের হীরামনি জোড়া লাগানো যমজ সন্তান প্রসব করেন। এদের একজন পূর্ণাঙ্গ শিশু আর একজনের মাথা, বুক ও দুই হাত ছিল না। অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি তার অর্ধেক শরীর নিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশুটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ যমজের অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু সার্জারি বিভাগের তখনকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন।

শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক রুহুল আমিন টেলিফোনে জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পর বাগেরহাটের মো. জাকারিয়া ও হীরামণি দম্পতির ওই সন্তান ভালো আছে। ছয় মাস আগেও ফলোআপে এসেছিলেন এই দম্পতি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0