আলাপের শুরুতেই গৌতম হালদার বলে নিলেন, তাঁর বাবার বাড়ি ঝালকাঠিতে। দেশভাগ হলে তাঁর বাবা চলে যান ওই ভাগ, মানে পশ্চিমবঙ্গে। ছেড়ে যাওয়া দেশ কিন্তু চেতনায় রয়েই যায়। দার্শনিক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কাছ থেকে ধার করে গৌতম হালদার বলেন, ‘সৃষ্টিশীল মানুষের কাজের ভেতরে থাকে তাঁদের শৈশব। ঠিক সেভাবেই আমার ভেতরে ছিল বাংলাদেশ। সেটা কীভাবে, এখন বুঝি।’

ছোট্ট গৌতম বাড়ির গুরুজনদের কাছে শুনতেন বাংলাদেশের গল্প। বরিশালের গল্প, তালগাছের গল্প, তালগাছের ভূতের গল্প। বাংলাদেশে না জন্মালেও বাবা আর দাদির কাছ থেকে শোনা গল্প শুনে এই দেশটাকে নিজের জন্মভূমি মনে হতো। সেই গল্পগুলো তাঁর ভেতরে কাজ করত সব সময়। সে কারণেই হয়তো জসীমউদ্‌দীনের ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ তাঁকে ভাবিয়েছিল। একে নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চে তুলেছেন তিনি।

থিয়েটার কীভাবে তার ভেতরে কাজ করে? রোজগার নাকি আদর্শিক কারণে এ অঙ্গনে রয়ে গেলেন তিনি? এ রকম একটি প্রশ্ন আগেই রেখেছিলেন গোলাম কুদ্দুছ। সেই প্রসঙ্গে গৌতম হালদার বলেন, ‘বাড়িতে ২৪টা রেশন কার্ড ছিল। মানে অনেক মানুষজন খাওয়াদাওয়া করত। রোজগার ছিল বাবার একার। এই যে অনেকে মিলেমিশে থাকা, খাওয়া, বাঁচার চর্চা, সেখান থেকেই শুরু। এই যে অন্যের সহিত মিলে থাকা, এ থেকেই তো সাহিত্য। আর জীবনে প্রতিনিয়ত এর চর্চা চালিয়ে যাওয়া সেটাই থিয়েটার। এভাবেই একদিন জীবনে থিয়েটারের চর্চা প্রবেশ করে।’

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সেখানে থিয়েটারের মানুষদের ভূমিকা নিয়েও জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে গৌতম হালদার বলেন, ‘একটি নাটকের দলের বিচার হয় তাদের নাটকে। আমরা ভালো নাটক, ভালোভাবে করার চেষ্টা করি।’ তির্যক হাসি দিয়ে সরাসরি তিনি বুঝিয়ে দেন, রাজনৈতিক দল নিয়ে এর চেয়ে স্পষ্ট করে তিনি কিছু বলবেন না। বরং নাটকের দল নিয়ে, নাটকের শক্তি নিয়েই ঘুরেফিরে বলতে চান কথা।

নান্দিকার দলে অভিনয় করতেন গৌতম হালদার। একপর্যায়ে সেটা থেকে বেরিয়ে পড়লেন ‘নয়ে নাটুয়া।’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা থিয়েটার দল এটি। বেশ কয়েকটি প্রযোজনা রয়েছে সেই দলের। তাঁর শক্তিশালী অভিনয় থিয়েটার থেকে টেলিভিশন ও সিনেমায়ও তাঁকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে।

আলাপচারিতায় মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের সচিবেরা কখনো স্কুলে পড়েনি। তারা একলাফে বিসিএস পাস করে সচিব হয়ে গেছে। এ কারণে তাদের কোনো শৈশব নেই। গ্রাম নেই, স্কুল নেই, শিক্ষক নেই। এ কারণে শিক্ষকদের সম্মানী এত কম। তাদের নাশতার খরচ দেওয়া হয় ছয় টাকা। কিন্তু সেই শিক্ষকেরা যখন ছাত্রদের সামনে দাঁড়ান, তাঁরা ঝলসে ওঠেন। একজন থিয়েটারকর্মীর অবস্থাও অনেকটা সে রকম। তাঁদের রোজগার নেই, কিন্তু মঞ্চে অভিনয়ের জন্য ভীষণ পরিশ্রম করতে হয় তাঁদের। তাঁদের রক্তের ভেতরে শৈশব খেলা করে। এ কারণেই তাঁরা পারেন। একজন অভিনেতা কেবল অ্যাক্টর নন, একজন অ্যাথলেটও। অনেক ঘাম ঝরিয়ে তাঁকে শিল্পী হয়ে উঠতে হয়।’

ভারতীয় অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহর একটি বিতর্কিত উদ্ধৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন অভিনেতা তৈরি করা যায় না, অভিনেতা জন্মায়। কথাটি বলে তিনি বিতর্কিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি এখন কথাটা বিশ্বাস ও প্রচার করতে শুরু করেছি।’

এখনকার ‘নায়ক’দের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাহিত্য পড়া না থাকলে কেউ শিল্পী হতে পারে না। সত্যজিৎ রায় একটি কথা বলেছিলেন, “থিয়েটারের মানুষেরা একটি জিনিসকে নানা দিক থেকে উল্টেপাল্টে দেখে। এটা সিনেমার লোকেরা পারে না। আমাদের গাধা–গরুরা চিরদিনের নায়ক হয়ে বসে আছে। সেই নায়ক শুধু কাঁদে। যেন কান্না ও হাসির মতো স্থূল অভিব্যক্তি ছাড়া আর কোনো অভিব্যক্তি নেই। “অপুর সংসার” সিনেমা মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর নায়কের অভিব্যক্তি ছিল কান্না–হাসির ঊর্ধ্বে।’

বাংলাদেশে দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে নাটক হয়। ভারতে এ নিয়ে পক্ষপাত আছে। এ প্রসঙ্গে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বাংলা কবিতার ইতিহাস যখন লেখা হবে, তখন সেটার নেতৃত্বে থাকবেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদেরা। সেখানে দুই বাংলার যোগ থাকবে। সে রকম বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রেও হওয়া চাই। থিয়েটারের ইতিহাস হবে অখণ্ড ইতিহাস।’

গঙ্গা–যমুনা সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২২ উপলক্ষে ঢাকায় এসেছেন গৌতম হালদার। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে ছিল তাঁর অভিনীত নাটক ‘মরমিয়া মন’। শুক্রবার তাঁর নির্দেশনায় প্রধান মিলনায়তনে রয়েছে ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’। শনিবার সন্ধ্যায় রয়েছে ‘বড়দা বড়দা’।