কালের পরিক্রমায় আলোচনা-সমালোচনায় আসেন প্রবাসীরা। তবে সব সময় প্রবাসীদের আলোচনার চেয়ে সমালোচনার পাল্লাটাই অনেক ভারী। প্রবাসীদের বাস্তবতার বিশ্লেষণ পুরোটাই ভিন্ন।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কথাটা সত্যি, কিন্তু এর সিংহভাগ চালিকা শক্তি কাদের হাতে, তা আমরা ভুলে যাই। ভুলে যাই ভূতপূর্বকাল। আজ হঠাৎ দেখি অনেক প্রবাসীদের ফেসবুক ওয়ালে নবাবজাদা নিয়ে অনেক স্ট্যাটাস, অনেকেই লিখেছেন, ‘আমি নবাবজাদা’।

এর কারণ ইতিমধ্যেই আমাদের কাছে স্পষ্ট। প্রবাসীরা নবাবজাদা তার বাস্তব প্রমাণও আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিটি রক্তকণিকা গড়ে উঠেছে তাঁদের কষ্টে উপার্জিত হালাল আয়ের টাকায়। কাউকে ঠকিয়ে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নিয়ে কিংবা কারও দয়ায় পাওয়া কোনো অর্থে তাঁদের রুটিরুজি বা সংসার চলে না।

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন প্রবাসী, পোশাকশ্রমিকসহ অনেকেই পেশার মানুষ। তাই দেশে বসে আমরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের গল্প করতে পারি। এই ‘নবাবজাদারা’ ফি বছর দেশে হাজারো কোটি টাকা প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) হিসেবে পাঠান। তাঁরা দেশে থেকে হাজারো কোটি টাকা পাচার করেন না। তাঁরা ব্যাংক লুট করেন না। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লুটে নেন না। তাঁদের যাবতীয় আয় জমা হচ্ছে দেশের কোষাগারে।

ঘটনার সূত্র করোনাভাইরাসের কারণে ইতালি থেকে দেশে আসা প্রবাসীদের নিয়ে। ইতালি থেকে দেশে আসা ১৪২ জন নাগরিককে নিয়ে বিমানবন্দর এবং পরবর্তী সময়ে আশকোনা হজ ক্যাম্পে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্রবাসীদের কেউ কেউ সেখানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, কেউ কেউ অশোভন আচরণ করেছেন। আমাদের রীতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে এসব আচরণ যায় না। যে লোকটি গালি দিয়েছেন আর যার এই গালি ও আচরণে আপনাদের বুকে এতটা আঘাত লেগেছে, তিনিও একবুক ব্যথা আর যন্ত্রণা ও ক্ষোভ থেকেই গালিগুলো দিয়েছেন। এ কথাগুলো শোনার পর অন্তত এটা বুঝতে বাকি থাকেনি যে লোকটি কেন আর কিসের ক্ষোভে তাঁর দেশকে এমন ভাষায় গালি দিয়েছেন।

টিভির প্রকাশিত ভিডিওতে একজনকে বলতে শুনেছি, ইতালি থেকে ফেরার পর তাঁদের নেওয়া হয় হজ ক্যাম্পে। সেখানে বেলা দুইটা নাগাদও দুপুরের খাবার দেওয়া হয়নি। বসার কোনো সুব্যবস্থাও ছিল না। নানা কারণে অনেকে খেপে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

ইতালিপ্রবাসীদের একসঙ্গে যেভাবে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাতে কোয়ারেন্টিন করা সম্ভব নয়। বরং আরও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে। তাঁদের নিয়মিত পর্যটনের খাবার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আয়োজনের কোথাও নিশ্চয়ই ঘাটতি ছিল।

প্রবাসীদের বলা হয় রেমিট্যান্স–যোদ্ধা। সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কি তাঁদের সব সুবিধা পাচ্ছে? নাকি তাঁদের অস্তিত্ব নিয়ে তামাশা করা হচ্ছে? কিছু সময়ের জন্য করোনাভাইরাস বাদ দিলাম। অন্য সময় প্রবাসীরা যখন দেশে আসেন, তাঁদের যথেষ্ট ভোগান্তি আর পদে পদে হেনস্তার শিকার হতে হয়। রুচিসম্মত ভাষাও পাওয়া যায় না বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ প্রবাসী নিতান্তই গ্রাম থেকে আসা। যখন কোনো প্রবাসী বিদেশ যান বা আসেন, তাঁর সঙ্গে বাবা, মা, ছোট ভাইবোনও বিমানবন্দরে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক যে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো জায়গায় বসার কোনো ভালো পরিবেশ নেই। নেই এক গ্লাস পানি খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা। বিমানবন্দরের গণ্ডির ভেতরে ঢোকার আগেই রাস্তা থেকে বিদায় জানায় বা প্রবাসীদের গ্রহণ করেন তাঁর মা-বাবা, ভাইবোন। যে প্রবাসী কষ্ট করে রেমিট্যান্স পাঠান, সেই প্রবাসী মারা গেলেও তাঁর মৃতদেহ দেশে পাঠাতে অনেক ভোগান্তি।

‘নবাবজাদারা’ শুধু অজানাকে জানার আর অচেনাকে চেনার নয়, জীবিকা ও জীবনের প্রয়োজনে সোনালি স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশিরা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।

দেশের প্রত্যেক মানুষের রক্তে মিশে আছে কোনো না কোনো প্রবাসীর ফোঁটা ফোঁটা গামের অর্জিত অর্থ। নিজের মাতৃভূমি, দেশের মাটি, আর প্রবাসজীবনের ব্যবধান আকাশপাতাল। দু-তিনজন প্রবাসী একত্র হলেই তাঁদের চায়ের আড্ডায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকে দেশের ভালো-মন্দ পরিস্থিতি। মনন দেশ এবং দেশের মানুষকে নিয়ে? শত কাজের মধ্যেও কল্পনায় থাকে মাতৃভূমি। কিন্তু এরপরও এই প্রবাসীদের নিয়ে সমালোচনা? কেন এত হয়রানি? কেন তাঁদের এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য? কেন তাঁদের সঙ্গে এত প্রতারণা? প্রতিটির কেনর উত্তর প্রবাসীরা পান না।


আরও পড়ুন:


বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0