করোনাকালে গবেষণা

আস্থার সংকটে স্বাস্থ্য খাত

বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য খাতের ওপর আস্থা নেই। সেই দলে আছেন স্বাস্থ্যকর্মীরাও।

বিজ্ঞাপন
default-image

ভিকারুন্নেসা বেগম চিকিৎসক। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি করেছেন। ২০০৯ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন। এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। নমুনা পরীক্ষার পর ১ সেপ্টেম্বর রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানায়, ভিকারুন্নেসা বেগম করোনায় আক্রান্ত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসা নিতে গিয়ে সরকারি হাসপাতালের ওপর তিনি বিরক্ত।

২ সেপ্টেম্বর সকালে ভিকারুন্নেসা বেগম রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। ওই হাসপাতালে কেবিন ফাঁকা ছিল না। পরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ভর্তি হন। ভিকারুন্নেসা বেগম বলেন, হাসপাতালে কেবিনে পর্দা ছিল না। প্রয়োজনীয় সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ছিল না। চার ঘণ্টায় তাঁর চিকিৎসারও কোনো উদ্যোগ ছিল না। একপর্যায়ে তিনি ওই হাসপাতাল ছেড়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন।

গতকাল সোমবার এই সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও সাবেক কর্মকর্তার পরিচয় দিয়েও আমি সেবা পাইনি। আস্থা রাখতে না পেরে আমি ঝুঁকি নিয়ে ওই হাসপাতাল ছেড়েছিলাম। সাধারণ মানুষ হাসপাতালবিমুখ কেন হয়েছে, নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি।’

শুধু ভিকারুন্নেসা বেগম একা হাসপাতালের ওপর আস্থা হারিয়েছেন বিষয়টি এমন নয়। সাধারণ মানুষেরও হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর আস্থা নেই, এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই ছিল। এখন গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের ওপর খুব কম মানুষ আস্থা রাখেন।

করোনাকালে বাংলাদেশে জাতিসংঘ যুব ও ছাত্র অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্য খাতের ওপর ২৪ শতাংশ মানুষের আস্থা নিম্ন পর্যায়ে। আস্থা আছে মাত্র ২৩ শতাংশের। আর বাকি ৫৩ শতাংশের আস্থা মাঝারি পর্যায়ের।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য খাতের ওপর কোনো আস্থা নেই। এটা বিপজ্জনক প্রবণতা। আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার, নাগরিক সমাজ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম সকলেরই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন
তৌফিক জোয়ারদার, প্রধান গবেষক ও পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক

গবেষণায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা, সেবাদানকারীদের ওপর মানুষের আস্থা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের আস্থার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এ নিয়ে ৫৯ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন ইতিমধ্যে তৈরি করেছেন গবেষকেরা। এ ছাড়া ওই গবেষণার তথ্য নিয়ে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড গ্লোবাল হেলথের রিডার শাহাদুজ্জামান, ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কার্যালয়ের গবেষণা বিশ্লেষক মোহাম্মদ নাহিদ বিন খালেদ এবং পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তৌফিক জোয়ারদার একটি গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন।

প্রধান গবেষক ও পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তৌফিক জোয়ারদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য খাতের ওপর কোনো আস্থা নেই। এটা বিপজ্জনক প্রবণতা। আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার, নাগরিক সমাজ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম সকলেরই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।’

গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের বিরাজমান দুর্বলতার পাশাপাশি করোনাকালে কিছু ত্রুটি দৃশ্যমান হয়ে দেখা দেয়। এর মধ্যে আছে প্রস্তুতি, সমন্বয়, নেতৃত্বের অভাব; নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে দুর্নীতি, নিম্নমানের সেবা, সেবার ক্ষেত্রে বৈষম্য বা কোনো সেবা না দেওয়া। এসব কারণে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ও নানা ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই না স্বাস্থ্য খাতের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হোক। স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধির নিয়মিত প্রচেষ্টা আমাদের আছে। স্বাস্থ্য খাতের ওপর মানুষের আস্থা যেন নষ্ট না হয়, তার দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও আছে।’
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘সম্রাটের শরীরে বস্ত্র নেই’

স্বাস্থ্য খাতে বাজেটস্বল্পতা, নিম্নমানের সেবা এবং বিশেষায়িত সেবার কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় জনস্বাস্থ্যবিদ গবেষক বলেছিলেন, মহামারি পরিস্থিতি গল্পের ‘সম্রাটের শরীরে বস্ত্র নেই’–এর মতো সত্য প্রকাশ করেছে।

গল্পের ওই সম্রাট বহু মূল্যবান বস্ত্র পরিধান করে জনসমক্ষে এসেছিলেন। অতি সূক্ষ্ম বস্ত্রের প্রশংসায় আশপাশের সবাই ছিলেন পঞ্চমুখ। অবাক হয়েছিল এক বালক। সে সত্য উচ্চারণ করে বলেছিল, ‘এ কী, সম্রাটের শরীরে বস্ত্র নেই।’

মহামারি স্বাস্থ্য খাতের আসল চেহারা উন্মোচন করেছে। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় মৃত্যু হয়। একপর্যায়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চাপ বাড়তে থাকে। হাসপাতালে সেবা না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। একাধিক হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে একাধিক মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক দেখা দেয়। করোনায় আক্রান্ত হলে কোথায় সেবা পাব, কোথায় ভর্তি হব—এটা অনেকটা সামাজিক দুশ্চিন্তার চেহারা নেয়। মানুষ নমুনা পরীক্ষার জন্য ছোটাছুটি করতে থাকেন। এ মহাদুর্যোগের মধ্যে মানুষ জানতে পারেন জেকেজি ও রিজেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ। মহামারির কারণে দুর্নীতি থেমে থাকেনি।

মহামারির এমনই জরুরি সময়ে গবেষকেরা স্বাস্থ্য খাতে মানুষের আস্থা নিয়ে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও ইন্টারনেটে ৫১৭ জন ব্যক্তির কাছে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে উত্তর নেওয়া হয় ১০ থেকে ১২ জুনের মধ্যে। এর মধ্যে ৩১৮ জন পুরুষ, বাকিরা নারী। তাঁদের বয়স ছিল ১০ থেকে ৫০ বছর বা তার বেশি। উত্তরদাতাদের ৯২ শতাংশ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া। তাঁদের মধ্যে ৯ শতাংশ ছিলেন কোভিড আক্রান্ত। এ ছাড়া ১৫ থেকে ১৭ জুনের মধ্যে সাতটি দলীয় সভায় ৫০ জন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্যকর্মীর মতামত নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সত্য উঠে এসেছে

গবেষণায় সত্য উঠে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, মহামারি শুরুর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনাস্থা প্রকাশ করা মানুষের হার আরও বেশি।

স্বাস্থ্য খাত জনসাধারণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় কি না, সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আছে কি না, সঠিক নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে সেবা দেওয়া হয় কি না, সেবাগ্রহীতাকে সঠিক ও মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া হয় কি না, রোগীর তথ্য গোপন রাখার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কতটা দক্ষ ও মনোযোগী, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সেবা পায় কি না—এমন বিষয়ে উত্তরদাতাদের ধারণা নেন গবেষকেরা।

উত্তরদাতাদের ৪৬ শতাংশ বলেছেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি তাঁদের ধারণা নিম্নমানের। ১৯ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের আস্থা আছে। বাকি ৩৫ শতাংশ বলেছেন তাঁদের আস্থা মাঝারি ধরনের।

২৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, চিকিৎসক–নার্স বা অন্যান্য সেবাদানকারীর ওপর তাঁদের আস্থা কম। অন্যদিকে ২৩ শতাংশের এখনো আস্থা আছে। উত্তরদাতাদের ৫৩ শতাংশ বলেছেন, সেবাদানকারীদের ওপর তাঁদের আস্থা মাঝারি ধরনের।

তবে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, নেতৃত্বের ঘাটতি, আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা আগে থেকেই ছিল। মহামারি শুরুর দিকে একাধিক কর্তাব্যক্তি বলেছিলেন, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর (পিপিই) প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে নিম্নমানের পিপিই বা নিজের অর্থে পিপিই কিনে চিকিৎসকদের ব্যবহার করতে হয়েছে। এসব কারণে চিকিৎসকদের কেউ কেউ চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর দৃঢ় আস্থা রাখতে পারছেন না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আস্থা থাকা জরুরি

গবেষকেরা বলছেন, আস্থা না থাকলে মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকে। এতে মহামারি পরিস্থিতিতে সংক্রমণ আরও বাড়ে, মৃত্যু বাড়ে। স্বাস্থ্য খাতে আস্থা না থাকলে মানুষ বিকল্প হিসেবে অন্য উৎস থেকে সেবা নেওয়ার চেষ্টা করে। তাতে স্বাস্থ্য ও আর্থিক ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।

অন্যদিকে আস্থা থাকলে মানুষের সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ে, স্বাস্থ্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার হয়, নিয়মিত সেবার সুযোগ বাড়ে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।

করণীয়

আস্থার উন্নতি ঘটাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, নিচের দিকে মানুষ সেবা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে ওপরের স্তরের হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি। কম চিকিৎসক বেশি রোগীর সেবা দিচ্ছেন বলে মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এতে আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

গবেষকেরা প্রতিবেদনের শেষ দিকে কিছু সুপারিশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে আলোচিত দুর্বলতাগুলো দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে। পাশাপাশি দুর্নীতি, আইন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, বৈষম্য হ্রাস নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করতে হবে। আস্থা ফিরিয়ে আনার আলোচনায় সেবাদানকারীদের যুক্ত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন