default-image

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের এক বছর পেরিয়েছে দেশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের এক বছর পেরিয়েছে দেশ। তবে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গেল বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। গত কয়েক সপ্তাহে দেশে করোনার সংক্রমণে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় এ চিত্র স্পষ্ট।

আজ সোমবার দুপুরে ‘দ্বিতীয় ঢেউ এবং করোনা ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ (বিএইচডব্লিউ) অনলাইনে হওয়া এই সংলাপের আয়োজন করে।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বিএইচডব্লিউর কার্যকরী কমিটির সদস্য ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক এ এম জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের পরামর্শ ও বিশেষজ্ঞ কমিটিতে যাঁরা আছেন, তাঁরা সবাই যে তাত্ত্বিক রোগতত্ত্ববিদ, সেটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে তাঁদের কথা নীতিনির্ধারকেরা মূল্য দিচ্ছেন না। করোনার পরীক্ষা বাড়ানোর কথা বলা যত সহজ, বাস্তবতায় তা ধোপে টেকে না। পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে কেউ করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে পারেনি। সংক্রমণ নির্ভর করে ভাইরাসের রূপান্তর ও মানুষের সচেতনতার ওপর। সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি সব সময়ই উপেক্ষিত।’

বিজ্ঞাপন

এ এম জাকির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনার দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যের ধরন থেকে এসেছে, এটা তিন মাসেও জানানো হয়নি। এটা সরকার জানায়নি। সরকার যদি এসব মানুষকে জানাত, মানুষ আরও সচেতন হতো। মানুষকে যত লুকাবেন, তত সে সন্দেহ করবে।’

লকডাউন প্রসঙ্গে জাকির হোসেন বলেন, ‘পাড়ায় পাড়ায় লকডাউন দেওয়া হয়েছিল গত বছর, যা পৃথিবীর কোথাও দেখা যায়নি। লকডাউন দেওয়ার আগে মানুষের সুযোগ-সুবিধা না দেখে দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে ১২ হাজার আইসিইউ দরকার। এটা শুধু করোনা পরিস্থিতি নয়, মানুষের দীর্ঘ জীবন নিশ্চিত করতে এগুলো দরকার। অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নেগেটিভ হয় এবং আরটিপিসি আর পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ নেগেটিভ হয়। এই নেগেটিভ আসার পর তাদের কীভাবে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করব, তা এখনো ঠিক হয়নি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় যোগাযোগের কৌশল নেই।’

এসব নিয়ে ওয়েবিনারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কোভিড-১৯–এর জন্য পরিস্থিতিতে যোগাযোগ কৌশল আছে। এর বাস্তবায়ন কতটুকু হলো, কতটুকু অর্জন, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন উঠতে পারে। অ্যান্টিজেন টেস্টের নেগেটিভ এলে তাঁকে পাঠানো হয় আরটিপিসিআর টেস্ট করতে—এটা নিয়ম আছে। এরও সমালোচনা থাকতে পারে কতটুকু কার্যকর হচ্ছে।’

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বদ্ধ ঘরে নানা অনুষ্ঠান, চলাচল হওয়ায় দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়িয়েছে উল্লেখ করে মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দুই সপ্তাহের জন্য এটি নিয়ন্ত্রণ করা হলে করোনা সংক্রমণ কমে যাবে বলে আশা। মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। এখন সংক্রমিতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। সংক্রমণের প্রাথমিক উৎস নির্মূল করলে সংক্রমণ কমে আসবে।’

এক সপ্তাহের ছুটি দিলে তা কার্যকরভাবে করোনা সংক্রমণ না–ও ঠেকাতে পারে বলে মনে করেন আরেক আলোচক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেসের সাবেক উপাচার্য লিয়াকত আলী। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণের উঁচু চূড়ার (পিক) ১৫ দিন আগে লকডাউন হলে ভালো হয়। কিন্তু দেশে টেস্টের সংখ্যা সীমিত ও শতভাগ নির্ভুল না থাকায় এই পিক মডেলিং করা সম্ভব হয় না। শুধু লকডাউন দিলেই চলবে না। এটির সঙ্গে জনগণের সম্পূর্ণ সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। কমিউনিটি লেভেলে সমর্থন না থাকলে লকডাউন দেওয়া শুধু আদেশ হয় এবং তা পাল্টা আঘাত আনতে পারে।’

লিয়াকত আলী আরও বলেন, ‘গত সাত দিনে দেশে যা ঘটল, তা লকডাউনের নামে বিধিনিষেধ। “লকডাউন” শব্দটার অপব্যবহার হলো। এসব আধা কাজ করলে মানুষ আস্থা হারায়। স্বাস্থ্য খাতে যে অবকাঠামোর অভাব, তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন। এই সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ এখনো আছে। গত এক বছরের অভিজ্ঞতা বলে, স্বাস্থ্য খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর যা সম্ভব ছিল, তা হয়নি। এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থতা দেখা গেছে।’

আলোচনা সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যায়ের অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের কথা কেউ ভুলে যাইনি। অনেক কিছুই করার চেষ্টা হয়েছে। তবে কোনোটাই বৈজ্ঞানিকভাবে করা যায়নি। প্রথম ঢেউয়ের ঘাটতি থেকে কোনো কিছু শেখা যায়নি, যা দ্বিতীয় ঢেউয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে।’

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন