এই বিপদের সময়ে আপনি মাস্ক পরবেন কি পরবেন না এটা একটা অনেক বড় বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে সুস্থ ব্যক্তিদের মাস্ক পরার দরকার নেই। আমরা যদি প্রাচ্যের দেশগুলোর (চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি) এখনকার অবস্থা দেখি তাহলে দেখব ঘরের ভেতরে বাইরে সবাই মাস্ক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার আমেরিকা অথবা কানাডার দিকে তাকালে দেখব বাইরে খুব কম সংখ্যক মানুষই মাস্ক পরছেন।

প্রাচ্যে বলা হচ্ছে সবারই মাস্ক পড়া উচিত। আর পাশ্চাত্যে বলা হচ্ছে শুধুমাত্র অসুস্থ ব্যক্তি, ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং যারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের সেবা করছেন শুধু তারাই মাস্ক পরবেন। এর পেছনে আরও একটি খবর আছে আর তা হলো অসুস্থ ব্যক্তি, ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং যারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের সেবা করছেন তাদের মাস্কের প্রয়োজন সুস্থদের চেয়ে বেশি। যেহেতু মাস্কের সরবরাহ কম তাই সুস্থদের মাস্ক পরতে নিষেধ করা হচ্ছে।

এখানে একটা জটিল ব্যাপার হচ্ছে আপনি কী করে জানেন যে আপনি অথবা আপনার পাশের লোকটি কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত নন ? আমেরিকা থেকে বলা হচ্ছে তাদের এখন পর্যন্ত সুনিশ্চিত প্রায় ২ লাখ করোনা পজিটিভের শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ এসিম্পটোমেটিক মানে তারা করোনার কোনো সুনিশ্চিত লক্ষণ প্রকাশ করছেন না। তাহলে? সমস্যা হলো যেকোনো আক্রান্ত ব্যক্তিই কোভিড-১৯ ছড়াতে পারেন। তাই আমি বলব মাস্ক পরাই ভালো। মাস্ক পরা ক্ষতিকর এমন কোনো তথ্য আমরা এখনো পাইনি।

আবার ফেস মাস্ক পরিধান করে আপনি যে আক্রান্ত হবেন না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশি থেকে নির্গত জলীয় কনা মাস্ক প্রতিহত করতে পারে। ভয় পাবার কিছু নাই এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে কোভিড -১৯ এর প্রধান ট্রান্সমিশন রুট হলো হাঁচি কাশি থেকে নির্গত জলীয় কনা।কোনো কোনো গবেষণায় মাস্ক পরে পাঁচগুণ সুরক্ষার প্রমান পাওয়া গেছে।মুক্ত বাতাসে কতক্ষণ এই ভাইরাস বাঁচে অথবা শুধু বাতাসের মাধ্যমে কোভিড-১৯ ছড়ায় কিনা এর কোনো পরিষ্কার তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। যদি বাতাসে ছড়ায় তাহলে মাস্কের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। 

তবে আপনার যদি সংক্রমিত কারও সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে অবশ্যই আপনাকে মাস্ক পরতে হবে। আপনার নিজের যদি কোভিড -১৯ এর নূন্যতম লক্ষণগুলোও থাকে তবুও মাস্ক পরবেন। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কখন মাস্ক পরবেন? সবসময়? অসুস্থ হলে সবসময়। আপনি আক্রান্ত হলে যদি বাসায় হোম আইসোলেশনে থাকতে হয় আপনাকে সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে হবে। বাসায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে থাকাকালীন আপনি অথবা আপনার পরিবারের যে কেউ কোভিড-১৯ এর যেকোনো লক্ষণ সন্দেহ করলে আপনারা মাস্ক পরবেন অন্যদের সুরক্ষার জন্যে।

ধরুন আপনি জরুরি প্রয়োজনে শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, বাস অথবা ট্রেনে উঠেছেন, সুপারস্টোরে বাজার করতে গেছেন অথবা এমনি অনেক জনবহুল জায়গায় যদি আপনি যান, মাস্ক পরা ভালো। কারণ আপনি যেমন জানেন না আপনি নিজে আক্রান্ত কিনা আবার এসিম্পটোমেটিক আক্রান্ত ব্যক্তিও আপনার পাশ দিয়ে যাবার সময় হাঁচি অথবা কাশি দিতে পারেন যা থেকে আপনি সংক্রমিত হতে পারেন।

আপনি সুস্থ থাকলে অবশ্যই সারাক্ষণ মাস্ক পরার দরকার নেই। ধরুন আপনি হোম লকডাউনে আছেন। ২-৩ সপ্তাহ হলো ঘরে বন্দী। আপনার মাস্ক পরার কোনো মানেই হয় না। আপনি বাড়িতে অবস্থান করছেন যেখানে অপরিচিত অথবা আপনি জানেন না এমন লোকের সঙ্গে দেখা হবার সম্ভাবনাই নাই সেখানে আপনি মাস্ক পরবেন না। আপনি বাসার ছাদে উঠে একা একা পায়চারি করছেন, মাস্ক পরার দরকার নেই।

প্রশ্ন হলো কি ধরনের মাস্ক পরবেন ? যেখানে মাস্কই নাই সেখানে আবার ধরনের প্রশ্ন কেন ? খুবই মূল্যবান প্রশ্ন। আমাদের দেশে সাধারণত যে মাস্কগুলো পাওয়া যায় সেগুলোর বেশির ভাগই ধুলাবালির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মাস্ক। অণুজীব সংক্রমণের কথা মাথায় রেখে ওগুলো বানানো হয় না। তবে আপনি যেই মাস্কই পড়ুন না কেন তা বাতাসে ভেসে বেড়ানো যেকোনো জলীয় কনা থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। এই মুহূর্তে ওই জলীয় কনাগুলোই কোভিড -১৯ সংবলিত যা কিনা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশি থেকে আসতে পারে। এমনকি আপনার যদি মাস্ক একদম নাও থাকে আপনি পরিষ্কার রুমাল অথবা অন্য কাপড় দিয়েও আপনার নাক মুখ ঢেকে রাখলে কিছুটা হলেও সংক্রমণের ঝুঁকি কমে আসবে। মনে রাখবেন নিশ্চিত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশি ছাড়াও স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের মাধ্যমেও কোভিড -১৯ ছড়াতে পারে। পরিধানকৃত কাপড়ের মাস্ক ঘনঘন পরিষ্কার করাটাও কিন্তু জরুরি। মাস্ক পরিধানের পরে সরাসরি রোদে ২-৩ ঘন্টা শুকালে মাস্কে থাকা বেশিরভাগ অণুজীব মারা যায় বলে জানা গেছে।

মনে রাখবেন শুধু মাস্ক কিন্তু আপনাকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচাবে না। আরও অন্যান্য নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলুন।

জেনে রাখি, সুস্থ থাকি, ভালো থাকি। গুজবে কান না দেই। ভীত না হয়ে সাবধান হই।

লেখক: অণুজীব বিজ্ঞানী এবং গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0