করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন-সমাচার

বিজ্ঞাপন
default-image

গত এপ্রিল মাসের অনলাইন সমীক্ষা অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মোট ১১৫টি ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে ৭৮টির কাজের অগ্রগতির প্রমাণ অনলাইনেই পাওয়া যায়। বাকি ৩৭টির বিস্তারিত বিবরণ অনলাইনে নেই।

এই ৭৮টির মধ্যে ৭৩টি এখনো প্রি–ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে আছে। বাকি পাঁচটি খুব দ্রুত অ্যাডভান্সড স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনটাও অনেক অ্যাডভান্সড পর্যায়ে আছে।

ভ্যাকসিন তৈরি করার জন্য প্রধানত তিনটি ধাপ বা স্টেজ পার হতে হয়। যেমন: ১. প্রি–ক্লিনিক্যাল স্টেপ (ল্যাবে পরীক্ষা, পশুর ওপর পরীক্ষা ইত্যাদি), ২. ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা (মানুষের ওপর পরীক্ষা, এটি আবার কয়েক ভাগে বিভক্ত), ৩. লাইসেন্স পাওয়ার পরের স্টেপ। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের কার্যক্ষমতা, ইমুনোজেনিসিটি, নিরাপদ কি না, ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

ক্লিনিক্যাল স্টেজের আবার চারটি ফেজ বা পর্যায় আছে। যেমন: ফেজ ১: ৫-৫০ জন মানুষের ওপর পরীক্ষা করা; ফেজ ২: ২৫-১,০০০ মানুষের ওপর পরীক্ষা করা; ফেজ ৩: ১০০-১০,০০০ মানুষের ওপর পরীক্ষা করা এবং ফেজ চার: ১,০০,০০০ মানুষের ওপর পরীক্ষা করা।

এখন কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা হচ্ছে করোনার ভ্যাকসিন আমাদের এত দিনের জানা ভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেকে আলাদা। এখানে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এর আগে প্রচলিত ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়নি। আমাদের অতি পরিচিত ভ্যাকসিন যেমন মিসেলস, মামস, রুবেলা ইত্যাদি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে অকার্যকর (এটেনুয়েটেড) ভাইরাস, মৃত ভাইরাস, ইন–অ্যাকটিভেটেড ভাইরাস অথবা ভাইরাসের একটা ছোট অংশ ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তাকে বলে ‘আরএনএ’ অথবা ‘ডিএনএ’ ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিন শরীরে ঢুকে ভাইরাসের মতো দেখতে কিন্তু বিপজ্জনক নয়, এমন প্রোটিন তৈরি করতে পারে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম একবার এই প্রোটিন চিনে রাখতে পারলে পরে সত্যিকারের ভাইরাস ঢুকলে তাকে সহজেই মেরে ফেলতে পারবে।

আসুন দেখি যে পাঁচটি ভ্যাকসিন সবচেয়ে এগিয়ে আছে সেগুলো কী কী। 
এক: mRNA-1273 (আমেরিকা)—এটি একটি আরএনএ ভ্যাকসিন, যেটি একটি লিপিড ন্যানো পার্টিকেল দিয়ে মোড়ানো থাকে। শরীরে ঢুকে এটি করোনাভাইরাসের মতো অবিকল দেখতে স্পাইক প্রোটিন তৈরি করে। এই ভ্যাকসিন বানাচ্ছে আমেরিকার মডার্না নামের এক কোম্পানি। তাদের ফেজ-এক ট্রায়াল দেওয়া হয়েছিল ৪৫ জন সুস্থ মানুষের ওপর। সেই রেজাল্ট ভালো আসায় এখন ফেজ দুই শুরু হয়েছে, যেটা করা হচ্ছে ৬০০ মানুষের ওপর। এরা লোনজা নামের এক কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা ঠিক করে রেখেছে। ফেজ-৩ এর পরে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএর অনুমোদন পেলেই বিলিয়ন ডোজ তৈরি করে দেবে। 
দুই: Ad5-nCoV—এটি বানাচ্ছে ক্যানসিনো বায়োলজিক্যালস (চীন)
তিন: INO-4800—এটি বানাচ্ছে ইনভিও ফার্মাসিউটিক্যাল (আমেরিকা) 
চার ও পাঁচ: LV-SMENP-DC এবং pathogen-specific aAPC—এই দুটি বানাচ্ছে শেনজেন জেনো ইমিউন মেডিকেল ইনস্টিটিউট (চীন)।

আমেরিকা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, এই ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে বাজারে আসতে তাদের ১৮ মাস সময় লাগবে।

এ ছাড়া বেশ কয়েকটি কোম্পানি ভাইরাসের বিপক্ষে অ্যান্টিবডি তৈরি করছে। এসব অ্যান্টিবডি শরীরে ঢুকলেই ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারবে। সমীক্ষায় দেখা যায়, বেশির ভাগ ভ্যাকসিন তৈরির কার্যক্রম চলছে আমেরিকায় (৩৬টি), এরপরে চীন (১৪টি)। এর পরে অন্যান্য এশিয়ান দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া (১৪টি) এবং সবশেষে ইউরোপে ১৪টি।

এদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি করা একটি ভ্যাকসিন। অধ্যাপক সারা গিলবার্ট ও তাঁর টিম এটি তৈরি করেছেন। তিনি শিম্পাঞ্জির একটি সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন, যাতে মানুষের ক্ষতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এই ভাইরাসের মধ্যে উনি করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন জুড়ে দিয়েছেন। ফলে এই ভ্যাকসিন নিলে আমাদের শরীরে শুধু করোনাভাইরাসে বাইরের স্পাইক প্রোটিন তৈরি হবে, আমাদের ইমিউন সিস্টেম এটাকে চিনে রাখবে। পরে যদি করোনাভাইরাসে আমরা আক্রান্ত হই, তাহলে আমাদের ইমিউন সিস্টেম সহজেই এটাকে ধ্বংস করে দিতে পারবে। এই ভ্যাকসিন আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই ব্যবহার করতে পারবে। এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে না।

অক্সফোর্ডের এই ভ্যাকসিনের নাম চ্যাডক্স (ChAdOx 1 nCoV-19)। ইংল্যান্ডে এটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে, জুনের মাঝামাঝি এই ট্রায়ালের রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এর মধ্যে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি গ্লাক্সোস্মিথক্লাইনের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে তাদের ভ্যাকসিন তৈরি শুরু করে দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, যদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের রিপোর্ট ভালো না আসে, তাহলে প্রস্তুত করা এই ভ্যাকসিনের কী হবে। তারা বলেছে, ফেলে দিতে হবে, কিন্তু দ্রুত এই ভ্যাকসিন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা এই লোকসান (যদি হয়) মেনে নিতে প্রস্তুত। তারা আশা করছে, এই বছরের সেপ্টেম্বর–অক্টোবরের মধ্যেই তারা এই ভ্যাকসিন বানিয়ে ফেলতে পারবে। এই ভ্যাকসিন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। কোন দেশ বা কারা আগে পাবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।

ডা. আরমান রহমান: ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড। লেখক একজন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী, অনলাইনে প্রাপ্ত তথ্যের সাহায্যে লেখাটি তৈরি করেছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন