করোনায় জীবনযাত্রায় কেমন রূপান্তর হতে পারে

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনাভাইরাস অতিমারিতে মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের প্রাত্যহিক সম্পর্ক, সরকার ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সঙ্গেও সম্পর্কের নয়া পরিবর্তন এসেছে। আপাতত হলেও। ফলে মানসিকতায় ও আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন কি অনিবার্য? অপরিকল্পিত/অরক্ষিত নগরবাসীর তুলনায় আপাতত গ্রামবাসীরা তুলনামূলক নিরাপদ হলেও তাদের কীভাবে এ অতিমারি প্রভাবিত করবে? আমরা কি আর অন্যজনকে কখনোই স্পর্শ করতে পারব না? সব সময়ই কি বাসায় থেকে কাজ করতে হবে? বহির্ভ্রমণ, মিটিং সামাজিক উৎসব উপাসনালয়ে ধর্মসভা আগের মতো করে যেতে পারব না?

এখনো কিছুই স্পষ্ট না, নিশ্চিত না। করোনা অতিমারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা বলা যায় না। এরপরেও কয়েক বছর হয়তো যাবে ভবিষ্যৎ বিশ্ব কীভাবে পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে।

দুর্যোগ, মহামারি শুধু যে সমস্যা চাপিয়ে দেয় তা–ই নয়, কিছু নয়া সুযোগ বা ইতিবাচক রূপান্তর আনে সমাজে। টেকনোলজি দিক থেকে সমাজে, রাষ্ট্রের আইনে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়।

১৯১৮ সালের ফ্লো, এরপর আর্থিক ‘মহামন্দা’কাল (গ্রেট ডিপ্রেশন), ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা বা অনেক কিছুই বিশ্ব সমাজকে দীর্ঘ মেয়াদে বদলে দিয়েছে। নিরাপত্তা, নজরদারি, রিয়াল এস্টেট ব্যবসা, মুদ্রা চলাচলেও বদল এসেছিল। গত ৮০-৯০ দশকে HIV/AIDS মহামারি অনেক সংস্কার আনতে বাধ্য করেছিল বিবাহপ্রথাকে অক্ষত রাখতে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ইতিবাচক সংস্কার আনতে হয়েছিল।

কোনো কাজ কারও সঙ্গে উপস্থিত হয়ে প্রচলিতভাবে একসঙ্গে করতে পারলে ভালো লাগত। কারও কাছে এখন হয়তো মনে হতে পারে এর উল্টো। মনে প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, এটা কিনতে কি দোকানে যেতেই হবে? অনলাইনে পায় যায় না?’ তাহলে তো সময়, এনার্জি, ট্রাফিক জ্যাম, হাউকাউ অনেক কিছু থেকে বাঁচা যায়।

চলমান করোনা মহামারি আমেরিকার ৫০ বছরের অধিককালের বিভাজনটি কিছুটা হলেও জোড়া দিতে সহায়তা করতে পারে। জাতীয় ঐক্য মজবুত করতেও পারে। কট্টর জাতীয়তা বোধ বৃদ্ধিও করতে পারে। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া জটিল বা শ্লথও করতে পারে।

দুটা বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, বিশ্বে সবার সামনেই অভিন্ন অদৃশ্য শত্রু কোভিড-১৯। কিন্তু রাষ্ট্রগুলো অভিন্ন প্রক্রিয়ায় এর বিরুদ্ধে লড়তে তেমন সচেষ্ট না। যেমনটা সন্ত্রাসবাদ, কমিউনিজম, রাসায়নিক অস্ত্রের, বাণিজ্য- লড়াই বিষয়ে হতো। এ বিষয়ে ইইউ/ন্যাটো/সার্ক/আসিয়ান ইত্যাদি অকেজো, নির্লিপ্ত।

দ্বিতীয়ত, অতিমারির আতঙ্কটি পরোক্ষভাবে একটি ‘রাজনৈতিক ও সামাজিক’ অভিঘাত হিসেবেও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে উপলব্ধ হতে পারে। ধনী-গরিব অধিকাংশ দেশেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রায় মানুষের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট যে বিবিধ স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ গ্রহের মহাসংকট আগমনের আগে তেমন সজাগ হয়নি। সজাগ হলেও তেমন প্রস্তুতি নেয়নি। অনেকটাই উদাসীন ও নিষ্ক্রিয় থাকে। ঐক্যবদ্ধভাবে জোরালো ভূমিকা নিতে উল্লেখযোগ্য সময় নষ্ট করে। ততক্ষণে করোনা পুরোদমে হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রাখে।

বৈশ্বিক মুক্তবাজার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়তো কিছুটা অবহেলিত, দুর্বল ও মন্থর হতে পারে। তবে দেশে দেশে ব্যক্তি একনায়কতন্ত্র আরও জোরদারও হতে পারে। যেমন, জল্পনা চলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনের নভেম্বরের নির্বাচন হয়তো পিছিয়ে দিতে পারেন, মিলিটারিদের নিজ দেশের মাঠে নামাতে পারেন আরও ব্যাপকভাবে।

default-image

তা ছাড়া চলমান চার দশকের বাজার-অর্থনীতি তৃণমূল সমাজের জন্য যে আশানুরূপ কল্যাণকর ও মানবিক নয়, তা তৃণমূলে উপলব্ধি থেকে চলেছে। করোনা মহামারিতে সুপার মার্কেটগুলোয় ক্রেতাসাধারণের কেনাকাটায় ব্যক্তির একচেটিয়া স্বার্থবাদী আচরণ হতে শুরু করে টোটাল মার্কেট সিস্টেম পর্যন্ত অনেক কিছুর আচরণই এর একেকটি প্রমাণ।

করোনা আতঙ্কে একটা বিষয় নজরে আসে যে কিছু মানুষ বাজারে ‘লুটেরার মতো ক্রয় ও রাক্ষসের মতো খাবার’-এর বদভ্যাসে হয়তো কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। একসময় ছিল মানুষ অভাবে না খেয়ে মারা গেছেন; সম্প্রতি ওপরতলার কিছু মানুষ বেশি খেয়ে হাসপাতালে মারা যাচ্ছেন। এটার সুরাহায় উপলব্ধি হয়তো আসবে। শ্রেণিগুলোর মাঝে মানবিক ও যৌক্তিক সমতা—মানে সাম্য-ভারসাম্য—হয়তো আনার চেষ্টা হবে।

দূরালাপন/অনলাইনের ভালো খারাপ দুটিই আছে। এটা মানুষে মানুষে/প্রতিষ্ঠানের মাঝে দূরত্ব বাড়াতে পারে। আবার অন্য অনেকের পারস্পরিক যোগাযোগও সৃষ্টি করতে পারে, অতীতের দূরত্ব হ্রাসও করতে পারে।

অনলাইন কলকাঠি (Skype, Facetime and email) আরও সহজ ও সুলভ হতে পারে সবার জন্য। বিশেষত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। প্রত্যেকের স্বাস্থ্য রেকর্ড, চিকিৎসকদের সঙ্গে কাউন্সেলিং, ব্যবস্থাপত্র, ডেভিড/ক্রেডিট কার্ডে/ই-লেনদেনে ওষুধ কেনাবেচা ও তা ঘরে ডেলিভারি সবকিছুই। ঘরে বসে লভ্য। উন্নত দেশে এসবের অধিকাংশই বর্তমানেই চালু। এর মাঝেও বিভিন্ন লবি-গ্রুপে (ডাক্তার-নার্স, ওষুধ ব্যবসায়ী, স্বাস্থ্য কর্মচারী ইউনিয়ন, রোগী অধিকার গ্রুপ ইত্যাদিতে) দর-কষাকষি আছেই, যা বিপত্তিকর।

শিক্ষাব্যবস্থা দূরশিক্ষণের আওতায় হয়তো ব্যাপক বৃদ্ধি হতে পারে। অন্তত হাইস্কুল পর্যন্ত। সব কাজই অবশ্য ঘরে বসে অনলাইনে হয়তো করা যাবে না। চার দেয়ালের প্রতিষ্ঠানে হয়তো কম সময় ব্যবহৃত হবে। ব্যয়বহুল ছাত্রাবাস এক সময় অজনপ্রিয় হতেও পারে এ অবস্থায়।

অনলাইন ভোট ব্যাপকতর হতে পারে। ২০১০ হতে দূরবর্তী মিলিটারি, বিদেশে কর্মরত নিজেদের কর্মচারী, প্রবাসী, স্বদেশে অক্ষম (অন্ধ, বধির, বিকলাঙ্গ ইত্যাদি) নিজ ঘরে বসে পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থায় ভোট দিতে পারে। এটা এ যাত্রায় সর্বসাধারণের জন্য ঐচ্ছিক বা বাধ্যবাধকতা হতে যাবে। সততা থাকলে, এতে অনেক খরচ ও ঝামেলা কমে যাবে। সৎ, দক্ষ, লোক চায় এতে।

এভাবেই সনাতনী ব্যবসায়িক কর্মক্ষেত্রও আদল-ধরন বদলে যেতে পারে। নিজস্ব কোম্পানির অ্যাপ দেবে তাদের কর্মীদের, তা দিয়ে সে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিজ ঘরে (গ্রাম/শহরতলি অগ্রগণ্য, অর্থাৎ ঘন শহর শিল্পাঞ্চলের অনেক দূরে) বসেই কাজ করার সুযোগ আরও বেশি পাবে। এর প্রচলন বেশ আগে হতেই ইত্যবসরেই চালু। এতে ব্যবসার ওভার-হেড-কস্ট অনেক কমে যাবে। উৎপাদন খরচ কমবে। এর ফলে, বর্তমান অর্থনীতির জনপ্রিয় খাতগুলোয় অনেক কর্মীই বেকার হতে পারেন। অন্যদিকে, নতুন নতুন খাতে নয়া চাকরিরও সৃষ্টি হবে। সে অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য, সরকার হয়তো সব নাগরিকের জন্য ‘সর্বজনীন বেকার ভাতা’, ‘সর্বজনীন স্থায়ী স্বাস্থ্য সেবা’ ইত্যাদির চিন্তা করতে হতে পারে।

ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা, উৎপাদন, বিতরণের বিষয়টা কিছু উন্নত দেশের প্রাইভেট সেক্টরে হয়তো ততটা আকর্ষণীয় বলে মনে হয় না। কারণ মুক্তবাজার মুনাফার মাত্রার ওপর চলে। প্রাইভেট ফার্ম/কোম্পানিগুলো দীর্ঘস্থায়ী মুনাফার নিশ্চয়তা না পেলে বিশাল বিনিয়োগ এই মন্দা সময়ে এগিয়ে আসবে কতটুকু, তা দেখার বিষয়। পরিশেষে, হয়তো পাবলিক সেক্টরকেই দায়িত্ব নিয়ে করোনা ওষুধ ও ভ্যাকসিন খাতে পদক্ষেপ নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। তাতেও সমস্যা হলো জাতীয় বিভাজন, আইন সভা/প্রতিনিধি সভায় বিভাজন।

সরকার, আইনসভা ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েক বছরেই হয়তো দ্রুত ভার্চ্যুয়াল উপায়ে কাজকর্ম চালু করতে পারে। করোনা অতিমারিতে সম্প্রতি ইউরোপ দক্ষিণ আমেরিকায় ইতিমধ্যেই এভাবে কাজ চলেছে, জরুরি ভিত্তিতে। অন্তত একটা কাজ হবে যে সাংসদেরা রাজধানী ছেড়ে নিজ নির্বাচনী এলাকায় থাকবেন, নিজ ভোটারদের পাশেই।

করোনাতে ইদানীং স্থানীয়, জাতীয় প্রশাসন অনেক সক্রিয় অবস্থায় লক্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান (ছিল)। প্রতিদিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, কর্মকর্তারা হেলথ-কোড মেনে দূরদর্শনে সরাসরি দর্শক জনগণের সঙ্গে সকাল–বিকেল সতর্কভাবে অতি প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দিচ্ছে। জনগণের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। উপস্থিত মুহূর্তের সঠিক তথ্যের মুক্ত প্রবাহের ফলে গুজব কম হয়।

সরকারগুলো এযাবৎ বৈদেশিক যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, প্রাকৃতিক মহাপ্রলয়, ফ্লো ইত্যাদি পরিচিত হলেও এই জীবাণু ভাইরাস অতিমারি প্রায় অপরিচিত। জাতীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তুষ্টি ছিল, আছে। তবু আশার কথা যে সরকারের সঙ্গে মিলে নাগরিক, প্রাইভেট সেক্টর, নাগরিক স্বেচ্ছা সংস্থাগুলো বিচ্ছিন্ন ও যৌথভাবে স্থানীয়/জাতীয় স্তরে করোনা রোধে কাজ করে যাচ্ছে। এর মাধ্যমেও এটাও ভালোভাবে উপলব্ধি হয়েছে যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো, বিশেষত স্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা, শিক্ষা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে আরও বিশেষজ্ঞ (দলীয়দের নয়) জনশক্তি নিয়োগ করা দরকার।

default-image

দরকার যে নেতৃত্বের ওপর গণ-আস্থা ধরে রাখার জন্য জনগণকে সঠিক সময়ে সম্পূর্ণ সত্য তথ্য সরাসরি শীর্ষমহল হতে জানানো। ঐতিহাসিক জন এম বেরি (২০০৪) ‘The Great Influenza’–এর প্রণেতা, লিখেছেন ১৯১৮ সালের ফ্লো, যে অতিমারিতে বিশ্বে অনুমিত ৫০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়, এতে প্রধান শিক্ষা হলো ‘ক্ষমতায় যারা আছেন, তাঁদের অবশ্যই জনগণের বিশ্বাস (public’s trust) অর্জন করতে হবে। এটা করার উপায় হলো কোনো কিছুই বিকৃত না করা, অতিরঞ্জন না করা, কাউকেই বোকা বা বিভ্রান্ত করে জোরে নিজের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা না করা।’

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘অতিমারি, আতঙ্ক, স্বাস্থ্যজ্ঞান’-এর ওপর স্বল্প মেয়াদি কোর্স চালু হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দ্বারা। সরকারি-বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণাকে উদ্ভাবনী উপায়ে আরও ভবিতব্য-বিষয়াবলির ওপর বিবিধ বিচিত্র গবেষণা শুরু করতে চিন্তাভাবনা করবে। সরকার ও বিশ্ব আর্থিক সংস্থাগুলো হয়তো বিবিধ সহায়তা দিতে বাধ্য হবে।

রাজনৈতিক উত্তাল তাণ্ডব অতি প্রত্যাশিত। এ মহামারি শেষ হওয়ার পর পরই। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রুপগুলো নিজেদের জোরালো এজেন্ডা নিয়ে রাজপথ কাঁপাবে, প্রায় নিশ্চিত। করোনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপকীর্তির ফলে এখন পর্যন্ত অধিকাংশে তৃণমূলের অক্ষম মানুষেরাই মরেছে। যারা যুগের পর যুগ ধরে অবহেলিত। ক্ষোভ ক্রমান্বয়ে পরিপক্ব হচ্ছে, বিস্ফোরণ অপেক্ষায়। তা অনুমেয়। তাই সেটায় জল ঢালার জন্য কর্তৃপক্ষের থাকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ আসাও প্রত্যাশিত।

দলগুলো নিজ নিজ রাজনৈতিক এজেন্ডায় ফোকাস হতে পারে, ‘সর্বজনীন বেকার ভাতা’, ‘সর্বজনীন স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা’ ইত্যাদির। বা এমন আরও কিছুর।

*লেখক: কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন