আমাদের এই জগৎসংসার কতটাই না বিস্ময়কর! কোনো এক অপরিচিত অণুজীবের আবির্ভাবেই এই বসুন্ধরার সব জটিল রাজনৈতিক, অথনৈতিক হিসাব–নিকাশ পাল্টে যায়। বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ আর সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের করোনাকে (বাংলায় যার অর্থ মুকুট) তাচ্ছিল্য করে জোরেশোরে মহামারির প্রস্তুতি চালাচ্ছে এক অণুজীব ভাইরাস। দিনকে দিন এই ভাইরাস ভয়ংকর প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। করোনা বা কোভিড-১৯–এর প্রকোপ আর আতঙ্কের কোপে আপামর সবাই এখন ঘরে অন্তরীণ।

কোনো রকম ভণিতা না করে বলেই ফেলি, এই এক করোনাভাইরাস আমাদের মনোবলে যতটা না ঘুণ ধরাতে পেরেছে, তার চেয়ে বরং রস-কষহীন লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং (সামাজিক দূরত্বায়ন), স্টে হোম (বাড়িতে থাকার নির্দেশ) শব্দগুলো অনেক বেশি ধন্দে ফেলে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে কিছু তথ্য আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদবিষয়ক চ্যানেল কেবল নিউজ নেটওয়ার্কের (সিএনএন) সাংবাদিক থেরেসা ওয়ালড্রপ সম্প্রতি তাঁর এক লেখায় জানিয়েছেন, এই শব্দগুলো একে অপরের সমার্থক না হলেও এগুলোর প্রয়োগের উদ্দেশ্য কিন্তু এক। আর তা হলো, সবাইকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা।

কোয়ারেন্টিন তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যিনি ইতিমধ্যে করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট সতর্কতামূলক অন্তরীণ সময়কাল পার করতে হবে। করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষায় পজিটিভ কারও ক্ষেত্রে এ অন্তরীণ সময়কাল ১৪ দিন। তারপর, পুনরায় সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষায় তিনি যদি পজিটিভ না হন, তবে তাঁর এরূপ অন্তরীণ পরিবেশে থাকার প্রয়োজন নেই।

আইসোলেশন মূলত দুই ধরনের সম্ভাব্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যাদের ক্ষেত্রে (ক) করোনাভাইরাসের শারীরিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়নি কিংবা মৃদু লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে; এবং (খ) করোনাভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, এমন অনুমানের ভিত্তিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক ফেডারেল এজেন্সি ‘সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল’–এর সুপারিশ অনুসারে সব ক্ষেত্রেই বাসায় পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সুনির্দিষ্ট কক্ষে অবস্থান করতে হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা ছাড়া অন্য কোনো কারণে ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। আইসোলেশন কিংবা কোয়ারেন্টিনে থাকা সবার ব্যক্তিগত ব্যবহার্য তৈজসপত্র আলাদা রাখতে হবে এবং পৃথক বাথরুমের ব্যবস্থা করতে হবে।

‘স্টে হোম’ বা ‘বাড়িতে থাকার’ নির্দেশ জারি করা বলতে বোঝায় সবাইকে যতটা সম্ভব বাড়িতে অন্তরীণ থাকতে বলা হচ্ছে। কেবল জরুরি পণ্য ক্রয়, স্বাস্থ্যসেবা বা ওষুধ কিনতে প্রয়োজন হলেই তাঁরা বাড়ি থেকে বের হতে পারবেন। এই ‘বাড়িতে থাকার’ নির্দেশ জারির উদ্দেশ্যের সারাংশ একটাই, আর তা হলো সামাজিক দূরত্বায়ন নিশ্চিত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় আর কর্মপ্রতিষ্ঠান তো ইতিমধ্যে বলেই দিয়েছে শিক্ষা, গবেষণা কিংবা কাজ, যা কিছু মুখ্য, তা করতে হবে নিজের বাসার চৌহদ্দির মধ্যে। তাই লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং—যা–ই বলুন, যদি মনে করেন এই কাঠখোট্টা শব্দগুলো আমাদের জন্য নিছক ছুটি উপভোগের উপলক্ষ এনে দিয়েছে, তাহলে বড্ড ভুল করবেন। আসলে কথা হলো, এই মুহূর্তে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং যেমন অতীব জরুরি, তেমনি অতি আবশ্যিক ঘরের চৌহদ্দির মধ্যে থেকে এই মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগানো। যেমন ধরুন, হতে পারে সেটা নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখার মধ্যে দিয়ে, অথবা নিজ নিজ চাকরি, শিক্ষা বা গবেষণার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে।

আরও একটা বিষয়ে কিছু বলতে চাই। একে তো গৃহবন্দী, তার ওপর আছে চাকরি হারানোর আশঙ্কা; গবেষণার ফান্ডিং জোগাড়ের দুশ্চিন্তায় ঘুম প্রায় নেই হয়ে যাওয়ার জোগাড়! এমন পরিস্থিতিতে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পাহাড়সম চাপ পড়াটাই স্বাভাবিক।

এই অনিশ্চিত সময়কে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া; নিজের মধ্যে ধৈর্যের চর্চা করা আর কাজে ব্যস্ত থাকার মধ্য দিয়ে নিজেদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারি। আমি জানি, এই কথাগুলো যতটা সহজে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি, বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকের জন্য ততটা স্বাচ্ছন্দ্যে ভেবে নেওয়া সহজ নয়। এ নিয়ে নেতিবাচক যুক্তি খণ্ডন করে লাভ নেই বিশেষ। আমি সবিনয় অনুরোধ করব, ওমর খৈয়ামের কয়েকটি লাইন মনে রাখার—

‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও,
বাকির খাতা শূন্য থাক।
দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে,
মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।’

যুদ্ধে শত্রুকে পরাজিত করার কৌশল হিসেবে অনেক সময় পিছিয়ে আসার মতো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে। কৌশলগত কারণেই, সবার মঙ্গল কামনায় অনেক সময় চরম কঠোরতা প্রদর্শন করতে হয়। যেভাবেই হোক, করোনাভাইরাসকে আমরা বিজয়ের মুকুট পরতে দেব না। চলুন, আমরা এই নিমিত্তে এক কদম পিছিয়ে আসি, নিশ্চিত করি সামাজিক দূরত্বায়ন। এই কঠিন সময়ে করোনায় মৃত বা কোয়ারেন্টিনে মানুষের পরিসংখ্যানে চোখ বুলিয়ে নিজেকে এবং পরিবারকে ভীত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নাহয় না–ইবা করলেন। সবিনয় অনুরোধ, তার চেয়ে বরং সময় দিন (অবশ্যই কিছুটা তফাতে থেকে!) নিজের প্রিয়জনকে; প্রযুক্তির দূরালাপন ব্যবহার করে খোঁজ নিন আপনার বয়োজ্যেষ্ঠ ও মামণি-আব্বুর।

*রুবাইয়াৎ রহমান, পিএইচডি অধ্যয়নরত, টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0