বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

করোনা মহামারি নিয়ে বই লেখা ও প্রকাশ শুরু হয়ে গেছে গত বছর থেকে। মহামারি নিয়ে বই লেখা হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিশ্ব এর আগেও মহামারির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। সেই মহামারিতে জীবনহানি ঘটেছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের। তবে সেই মহামারির ঢেউ বিশ্বের সব প্রান্তে পৌঁছায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৭৫-৮০ বছর আগের ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে, এখনো লেখা হচ্ছে। যুদ্ধের ইতিহাস, পটভূমি, রাজনীতি, অর্থনীতি, অস্ত্র, গুপ্তচরবৃত্তি, দেশভাগ, শরণার্থী, উদ্বাস্তু, মৃত্যু—এসব নিয়ে নাটক, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাগ্রন্থ দেশে দেশে লেখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও বিশ্বের সব দেশকে বিপর্যস্ত করেনি। গোটা বিশ্বকে বিপর্যস্ত করেছে করোনা।

করোনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা, শ্রমজীবীসহ প্রায় সব শ্রেণি–পেশার মানুষ। বিজ্ঞানীদের মধ্যে আছে নানা ধরন, নানা বিভাগ। একই কথা অন্যান্য শ্রেণি–পেশার মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ধরনের। তাঁদের অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বই লিখবেন। অনেকে ইতিমধ্যে লিখেও ফেলেছেন। অনেকে বই লেখার পরিকল্পনা করেছেন। এখন পরিকল্পনা না করলেও ভবিষ্যতে অনেকেই বই লিখবেন নিশ্চয়ই।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও ব্র্যাকের সাবেক ভাইস চেয়ার মোশতাক রাজা চৌধুরীর পরিবারের একাধিক সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং আক্রান্ত হননি, এমন সবাই মিলে একটি বই লিখেছেন। ‘করোনা উপাখ্যান: অতিমারি শাসনে এক পরিবারের কলম-যুদ্ধ’ নামে বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ।

default-image

মহামারি মোকাবিলায় ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও বিশ্বের অভিজ্ঞতা স্থান পাচ্ছে ব্যক্তিগত যোগাযোগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে। সেখানে পরিবার প্রায় অনুপস্থিত। পরিবারের শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠের করোনার অভিজ্ঞতা এক না। বইটির পরিকল্পনা অসাধারণ। এতে আছে ব্যক্তির পাশাপাশি এক টুকরো বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে আছে পরিবার। পরিবারও যে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছে, বইটি সেই কথাই বলছে।

করোনা বিষয়ে প্রথম যে বইটি এই প্রতিবেদকের হাতে আসে, সেটি প্রথমা প্রকাশনের। অনুবাদ করা বই। অনুবাদ আবুল বাসারের। মূল লেখক ড. মাইকেল মোসলি। ড. মোসলি মূলত স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক, টিভি উপস্থাপক ও চিত্রনির্মাতা। মূল বই: ‘কোভিড-১৯: হোয়াট ইউ নিড টু নো অ্যাবাউট দ্য করোনাভাইরাস অ্যান্ড দ্য রেস ফর দ্য ভ্যাকসিন’। অনূদিত বইটির নাম ‘কোভিড-১৯: করোনাভাইরাস, যা জানা দরকার’।
চীনের রণকৌশলবিদ সান জু তাঁর ক্ল্যাসিক বই ‘দ্য আর্ট অব ওয়্যার’-এ লিখেছেন, শত্রুকে বুঝতে পারার মাধ্যমেই বিজয় অর্জিত হয়। বইয়ের শুরুতে ড. মোসলি করোনাভাইরাসকে ‘সিরিয়াল কিলার’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর সঙ্গে লড়াই করতে হলে ভাইরাসটি সম্পর্কে জানতে হবে। নামটি প্রমাণ সাইজের: সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনাবাইরাস-১। নামটি অনেক বড় হলেও একটি আলপিনের ডগায় ১০ কোটি ভাইরাস অনায়াসে এঁটে যায়। মূল বইটি যখন লেখা হয়েছিল, তখন কোনো টিকার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু টিকা নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তার আভাস বইয়ে দেওয়া আছে। আর অনুবাদক আবুল বাসার ইমিউনোলজিস্ট স্যার পিটার মেডায়ারকে উদ্ধৃত করে বই শুরু করেছেন। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে পিটার মেডায়ার ভাইরাসকে বলেছিলেন, ‘প্রোটিন দিয়ে মোড়ানো এক টুকরো দুঃসংবাদ’। এটা যে কত বড় দুঃসংবাদ, তা বিশ্ববাসী হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে।

করোনাভাইরাস বিপজ্জনক হয়ে কত দিন থাকবে, তা এখনো জনস্বাস্থ্যবিদ ও ভাইরাস বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট না। প্রতিদিন এই ভাইরাস নিয়ে সারা বিশ্বে অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, অর্থনীতিতে এই ভাইরাসের প্রভাব নিয়ে অনেক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা হচ্ছে। এই ভাইরাসের গতি বোঝার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরাও গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশ হওয়ার কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি। সম্ভবত কারণ এই যে মহামারি এখনো শেষ হয়নি।

default-image

তবে মহামারি নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যে ভারত কী করেছে, তা নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. চন্দ্রনাথ লহরিয়া, টিকা গবেষক ড. গঙ্গাদ্বীপ হ্যাং এবং দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের পরিচালক ড. রণদ্বীপ গুলেরিয়া যৌথভাবে বইটি লিখেছেন। বইটির নাম ‘টিল ইউ উইন: ইন্ডিয়া’স ফাইট অ্যাগেইনস্ট দ্য কোভিড-১৯ প্যানডেমিক’।

ভারত কখন এই মহামারি অতিক্রম করতে পারবে, কত দিন মানুষকে মাস্ক পরে চলতে হবে, কখন একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকা হাতে আসবে, টিকা নেওয়ার পরও মাস্ক পরার প্রয়োজন হবে কি না, কোভিড-১৯–এর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলে কী হবে, ‘নতুন স্বাভাবিক’ সময়ে ব্যক্তি ও কমিউনিটির আচরণ কী হবে, কোভিড-১৯ থেকে আরোগ্য লাভের সময়ে আপনি কী করবেন, আমনে এগিয়ে যাওয়ার পথ কী—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চেষ্টা হয়েছে বইটিতে। বইটি মূলত রাজনৈতিক নেতা, নীতিনির্ধারক ও চিকিৎসকদের উদ্দেশে লেখা হয়েছে। বইয়ের শেষ প্যারায় এই তিন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘অনেক কিছু বদলে গেছে, আমরা জটিল সময় পার করছি। কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার পরিবর্তে আশা করার অনেক কিছুই আছে। কারণ, প্রয়োজনীয় যে সমাধান চাই, তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হাত ধরেই আসবে। সবার জন্য একটি সুন্দরতর ও স্বাস্থ্যসম্মত পৃথিবী আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে তৈরি করতে পারি।’ এই বই প্রকাশ হওয়ার পর ভারত করোনা মহামারির দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমিনেন্স ‘কোভিড-১৯: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ’ নামে ৬৬৬ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ করেছে। বইটিতে ৫৬টি নিবন্ধ আছে। এগুলো জনস্বাস্থ্যবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের লেখা। এর মধ্যে কিছু লেখা আগেই গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছিল। বইটির মূল্য লেখা আছে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। সঙ্গে এ কথাও বলা আছে, বইটি থেকে যে আয় হবে, তা কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করা হবে।

মহামারির কারণে এ বছর একুশে বইমেলা জমেনি। নিয়ম রক্ষার জন্য অনুষ্ঠিত মেলায় কটি করোনার বই প্রকাশিত হয়েছিল, তা জানা সম্ভব হয়নি। অতিসম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগ এলাকার বইয়ের দোকানঘুরে কয়েকটি বই দেখা গেছে। এর মধ্যে আছে সৌমিত্র চক্রবর্তীর লেখা ‘করোনা বৃত্তান্ত’ (অনুপম প্রকাশনী), ড. মোহাম্মদ আবুল হাসানের ‘করোনা থেকে বাঁচার উপায়’ (এ্যাবাকাস পাবলিকেশন), ডা. নুরুন নেছা বেগমের ‘করোনা মহামারি ও পরিবর্তিত বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য’ (জাগৃতি প্রকাশনী), মোহন চৌধুরীর ‘অতিমারি মহামারি করোনা’ (সুচয়নী পাবলিশার্স), অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর ‘ফাইট ব্যাক করোনা ভাইরাস’ (মুক্তধারা), শাইখ আবুল ওয়াফা শামসুদ্দিনের ‘বৈশ্বিক মহামারি ও সমকালীন করোনা’ (আর-রিহাব পাবলিকেশন্স) ও অধ্যাপক কামরুল হাসান খানের ‘করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ, সতর্কতা এবং ভ্যাকসিন’ (আগামী প্রকাশনী)।

‘করোনা প্যানডেমিক: এবিসিস অব কোভিড-১৯’ নামের পুস্তিকা লিখেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ মিজান সিদ্দিকী। সেটি ছেপেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাবলিক হেলথ সার্ভিসেস অ্যান্ড সোলুশানস। বাতিঘর দুটি বই প্রকাশ করেছে। একটি মঈনুস সুলতানের ‘যুক্তরাষ্ট্রের মফস্বলে করোনা সংকট ও বর্ণ বিভেদ’ এবং অন্যটি রিজওয়ানুল ইসলামের ‘করোনাঘাতে অর্থনীতি ও শ্রমবাজার’। বাজারে আরও বই আছে।

সাংবাদিক জান্নাতুল বাকেয়া কেকার লেখা ‘বাংলাদেশের করোনাকাল: সাংবাদিকের চোখে’ নামের বইটি ছেপেছে পাঠক সমাবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ‘কোভিড-১৯ দ্য আদারসাইড অব লিভিং থ্রো দ্য প্যানডেমিক’ বইয়ের সম্পাদনা করেছেন। এটিও ছেপেছে পাঠক সমাবেশ। পাঠক সমাবেশের ছাপা হাসনাত আব্দুল হাইয়ের লেখা ‘ইকোনোমিক ইসুজ দ্যাট ম্যাটারস’ বইয়ে ‘করোনা ইকোনিকস’ নিয়ে একাধিক অধ্যায় আছে।

করোনা নিয়ে অনেকে ছড়া লিখেছেন। ছড়াকার ও জনস্বাস্থ্যবিদ রোমেন রায়হানের ‘এই দেশে ভুল করে এসেছিল করোনা’ নামের বই প্রকাশ করেছে অন্বেষা প্রকাশনী। এতে ১২০টি ছড়া আছে। ছড়াকার সুজন বড়ুয়ার ‘বন্ধদিনের ছন্দগাথা’ ছেপেছে আদিগন্ত প্রকাশন। আর ছড়াকবি ফারুক হোসেনের ‘করোনা কাউকে করে না করুণা’ ছেপেছে অনন্যা।

মহামারি এখনো শেষ হয়নি। হয়তো সময় আসেনি মহান কোনো সৃষ্টির, না উপন্যাসের, না কবিতার। গত বছর মার্চে বিধিনিষেধের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সময় অনেকে ঘরে বসে আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ পড়েছেন। অনেকে ‘দ্য প্লেগ’ পড়ার অভিজ্ঞতা ফেসবুকে শেয়ারও করেছেন। করোনা নিয়ে এখনো এই মানের বই কেউ লিখেছেন বলে জানা যায় যায়নি। তবে সময় শেষ হয়নি।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন