default-image

এত দিন করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ ভাইরাসটি পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো চষে বেড়িয়েছে। বিষুবরেখার উত্তরে এত দিন ছিল শীতকাল। এখন সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে যাচ্ছে। এত দিন সেখানে ছিল গ্রীষ্মকাল। এখন ওই গোলার্ধে শীতকাল আসছে। করোনার প্রকোপও সেদিকে যাচ্ছে।

এখন দেখতে হবে করোনা বেল্ট কি শীতের দেশগুলো অনুসরণ করছে? যদি দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ প্রভৃতি উত্তর গোলার্ধের শীতপ্রধান দেশগুলোতে করোনার প্রকোপ কমে দক্ষিণের অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের দিকে বাড়ছে, তাহলে হয়তো এই গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে শীত-গ্রীষ্মের সঙ্গে করোনাভাইরাসের গতিবিধির সম্পর্কের প্রশ্নটা গুরুত্ব পাবে।

করোনাভাইরাস শীতের দেশেই সহজে বিস্তার লাভ করে আর গরমে টিকতে পারে না—এ প্রশ্নটি ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে আলোচিত হচ্ছে। কারও কারও মতে কোনো সম্পর্ক নেই, আবার কেউ কেউ বলছেন আছে। বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলার সময় এখনো আসেনি। দেখতে হবে করোনাভাইরাসটি কোথা থেকে কোথায় যায়। এটা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালো করে বিশ্লেষণ করে তবেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

হয়তো কেউ বলবেন, ‘শীত বা গরমের দেশের বিষয়টি জানতে পারলে কী আর হবে? আসল তো হলো এ রোগের ওষুধ, প্রতিষেধক বা টিকা। সেটাই যদি বের করতে না পারি, তাহলে শীত-গ্রীষ্ম নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কী আছে?’

ওষুধ তো নিশ্চয়ই দরকার। জীবন-মরণের প্রশ্ন। ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। হয়তো শিগগিরই বের হয়ে যাবে। তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং এটা ফলপ্রসূ হওয়ার বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসতে কিছু সময় লাগবে।

কিন্তু ভাইরাসটি গরমে টিকতে পারে কি না, সেটা জানাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক বলেছেন, গরমে এই ভাইরাস টিকতে পারে না। এখন অস্ট্রেলিয়ায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে এখন শীতের শুরু। এ দুইয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি তা-ই হয়, তাহলে এটি একটি সিজেনাল ভাইরাস হতে পারে। তাহলে বুঝতে হবে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো যদি ক্রমে করোনাভাইরাসমুক্ত হয়ও, পরবর্তী বছর শীতে আবার আসবে। সে জন্য প্রস্তুতি আগে থেকে নিতে হবে। সে জন্যই করোনাভাইরাস বেল্ট সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দরকার।

আমরা দেখেছি প্রথমে চীন, তারপর উত্তর কোরিয়া, জাপান, ইরান, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, ইতালি, জার্মানি, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ইংল্যান্ড-আমেরিকা প্রভৃতি বেশি আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত প্রভৃতি দেশেও এখন করোনাভাইরাসের তেমন বিস্তার লাভের খবর আমরা পাইনি। এরা সবই উত্তর গোলার্ধে।

আরেকটি মিল আমরা লক্ষ করব। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোর মধ্যেও কিছু দেশে রোগের বিস্তার খুব বেশি আবার কিছু দেশে কম। এটা কেন? চীনের জনসংখ্যা আর ভারতের জনসংখ্যা তো কাছাকাছি। তাহলে চীনে যদি এমন ভয়াবহ অবস্থা হয়, ভারতে এখনো তেমন নয় কেন? বাংলাদেশেও তো জনবসতির ঘনত্ব কম নয়। তাহলে পার্থক্য কেন? এই ব্যতিক্রমগুলো নিয়ে ভালো গবেষণা দরকার।

তবে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো। উত্তর গোলার্ধের তুলনামূলক বেশি ধনী দেশগুলোই বেশি আক্রান্ত হয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে এই যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দিনে প্রচণ্ড গরম থাকলেও রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা। কারণ, মেঘহীন আকাশে সন্ধ্যার পরপরই ভূপৃষ্ঠের সব উত্তাপ আকাশে উবে যায় এবং রাতে ঠান্ডা পড়ে। আর দিনের বেলায় ঘরে ঘরে এসি, গাড়ি, দোকানপাটে এসি। গরমের দেশ হলেও ওরা মোটামুটি শীতের মধ্যেই থাকতে পারে। ওরা তুলনামূলক ধনী। তাই ওই সব দেশে গরম বেশি পড়লেও ওদের এসি চলে বেশি। তাই হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ-ভারত প্রভৃতি দেশে এর প্রকোপ দেরিতে পড়েছে বা কিছুটা কম।

বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক দ্য ইকোনমিস্ট এ সপ্তাহে (২৮ মার্চ) এই বিষয়ে লিখেছে। বলেছে, এটা লক্ষণীয় যে বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে করোনার প্রকোপ কম। অবশ্য একই সঙ্গে সাবধানতা উচ্চারণ করে বলেছে, গরিব দেশেও পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যেতে পারে।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো দেশগুলোতে আশঙ্কা তুলনামূলক কম। হয়তো বেশিও হতে পারে। কারণ এখানে রোগের বিস্তার রোধের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই এসব ব্যাপারে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সময় আসেনি। আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা দরকার।

সুতরাং আমাদের যেকোনো ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, শুধু এ বছরের জন্যই নয়, আগামী বছরের এই মৌসুমের জন্যও।

সম্প্রতি একটা সুখবর পেয়েছি যে যেসব রোগী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাঁদের রক্তের প্লাজমা অন্য রোগীদের শরীরে ব্যবহার করে তাঁদের করোনা রোগ থেকে সুস্থ করে তোলা যেতে পারে। কারণ সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের শরীরে করোনা রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। সেটা অন্যের শরীরে স্থানান্তর করলে সুফল পাওয়া যাবে। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগে বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর এভাবেই চিকিৎসা করা হতো। যদি এটা কাজে দেয়, তাহলে এই দফায় হয়তো পৃথিবী করোনার আগ্রাসন থেকে এ বছরের জন্য হলেও মুক্ত হতে পারবে।

ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বে প্রায় লাখেরও বেশি ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাঁদের প্লাজমা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে সামাল দেওয়া সহজ হবে।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিষয়টি খুব সহজ নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েই আমরা প্রতিকারের ব্যবস্থাগুলো কাজে লাগাতে পারব।

এর আগে রোগটি দেশে নিয়ন্ত্রণের জন্য লকডাউন, কোয়ারেন্টিন ও বহুল প্রচারিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো সবাইকে মেনে চলতে হবে। আপাতত দু-তিন সপ্তাহ ঘরে থাকুন। জরুরি কাজ ছাড়া কেউ বাইরে যাবেন না। সামাজিক মেলামেশা আপাতত বন্ধ রাখুন। সামান্য অসুস্থতা বোধ করলে স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি সেবার জন্য যোগাযোগ করুন। নিজে বাঁচুন। আশপাশের দশজনকে বাঁচান।

আব্দুল কাইয়ুম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন