default-image

‘করোনার জন্য বাহে সবকিছু বন্ধ, হামার কাম-কাইজও নাই। গত চাইর-পাঁচটা দিন যে কেমন করি কাটানু, সেইটা শুধু আল্লাহই জানে। সেই ভোর বিহানে আইসে আস্তাত বসিনু, কাহো পুছেও না।’ পঞ্চাশোর্ধ্ব কাউসার হোসেনের পকেট ফাঁকা। ঘরের খাবার যে কিনবেন, সে টাকা রোজগারের কোনো পথও জানা নেই। তাই মনে আশা নিয়ে সারা দিন পথেই ঘোরেন, বসে থাকেন।

একই অবস্থা জাফর আলীরও। গত বছর করোনার ধাক্কায় গাজীপুর ছেড়েছিলেন। এক মাস আগে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার বালিয়াকান্দি গ্রাম থেকে আবার এখানে এসে জুটেছেন। এবার আরও চরম অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন। জাফর আলী বলেন, সারা দিন কাজ করে বিকেলে মজুরি নিয়ে বাজার করেন। তারপর বউ-বাচ্চা খেতে পায়। এখন জমানো কিছু টাকা দিয়ে কোনোরকমে চলছে। বৈশাখ মাসের শুরু থেকে সব সময় কাজ থাকে। কিন্তু এবার করোনার জন্য সবকিছু বন্ধ থাকায় বাংলা বছরের শুরুটাই খারাপ গেছে।

শ্রমের বাজারে কাজ নেই। তবু গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে উড়ালসড়কের নিচে প্রতিদিনই জমে কাউসার কিংবা জাফর আলীদের ভিড়। এখানেই কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। এঁদের কেউ নদীভাঙনের শিকার হয়ে গাজীপুরে এসেছেন। কারও আবাদি জমি নেই, তাই কাজের সন্ধানে আসা। একই অবস্থা দেখা গেছে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মার্কেটের পাশে দিনমজুরদের হাটেও।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিকদের ভিড় শুরু হয় সকাল ছয়টা থেকে। আটটা না বাজতেই সড়কের মধ্যে অপেক্ষমাণ দিনমজুরের সংখ্যা এক শ ছাড়িয়ে যায়। কোদাল আর টুকরি নিয়ে মাটিকাটা শ্রমিকেরা প্রতীক্ষায় থাকেন। পথচারীরা তাঁদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঘিরে ধরছেন কাজ পাওয়ার আশায়। শ্রমিক নিতে আসা লোকজন ঘণ্টা বা দিনের হিসাবে দরদাম করে মজুরি ঠিক করেন। অভিজ্ঞতা আর কাজের ওপর ভিত্তি করে দৈনিক সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়ে থাকেন শ্রমিকেরা। কিন্তু এখন লকডাউনের কারণে কাজই পাচ্ছেন না তাঁরা। কাজের আশায় বসে থেকে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

কোনাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন ভোরে দুই শতাধিক দিনমজুর শ্রমিক আসেন কাজের খোঁজে। কোনাবাড়ী আনসার মার্কেটের সামনে বসে ছিলেন জহুরুল ইসলাম (৫৫)। বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া এলাকায়। এখন বসবাস করে কোনাবাড়ীর কাদের মার্কেট এলাকায়। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি প্রায় প্রতিদিন সকালে এই বাসস্ট্যান্ডে আসেন কাজের জন্য। কাজও জুটত। তবে এখন কাজ নেই, পরিবারে খাবার সংকট।

কথা বলতেই কেঁদে ফেললেন আয়েশা খাতুন (৩৭)। তিনি বলেন, ঘরে চার সন্তান। চার-পাঁচ দিন ধরে প্রতিদিন সকাল ছয়টায় এসে তিন-চার ঘণ্টা বসে থেকে বাড়ি ফিরেন। জমানো কিছু টাকা দিয়ে কোনোরকমে চলছেন। দু–এক দিনের মধ্যে কাজ জোটাতে না পরলে ঘরে কোনো খাবার থাকবে না।

হাতে কোদাল আর ঝুপরি নিয়ে সড়কদ্বীপে বসে আছেন শাহনাজ বেগম (৪০)। তিনি বলেন, তিন-চার দিন হলো কাজের জন্য ঘুরছেন, কিন্তু কাজ পাচ্ছেন না। সরকারি তহবিল থেকে সাহায্য চাইলে কাউন্সিলর আর মেম্বাররা বলেন, ‘ভোটার হলে দিতাম।’ তবু প্রতিদিন নাম লিখে নেয় কিন্তু কিছুই দেয় না। তিনি বলেন, ‘এখন গ্রামে ধান কাটা লাগছে। গ্রামে গেলে কয় দিন কাজ করতে পারতাম কিন্তু লকডাউনের কারণে গাড়ি চলে না, তাই এখানে সকাল থেকে বসে থাকি যদি কাজ পাই।’

ইট ভাঙা, রাজমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রির সহকারী, মাটি কাটা, ধান কাটা থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই যে এখানকার শ্রমিকেরা করেন না। তবে এখন কেউ কাজ করাচ্ছেন না।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন জানান, মেয়রকে বলা হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য কিছু বরাদ্ধ দেওয়া যায় কি না, তা ভেবে দেখতে।

এসব খেটে খাওয়া মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনও কোনো বরাদ্দ রাখেনি। গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম বলেন, দিন আনে দিন খায়, এমন মানুষের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হয়নি। তবে পরবর্তী সময়ে লকডাউনের সময় বৃদ্ধি করা হলে তখন হয়তো বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা হবে।

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন