default-image

২১ মার্চ, লন্ডন সময় দুপুর ১২টা।

আমি এখন এখানে (লন্ডন শহরে) গৃহবন্দী। কোনো সরকার অথবা কোনো কোর্টের আদেশে নয়, নয় কোনো অপরাধের জন্য শাস্তি। এ গৃহবন্দী স্বেচ্ছায় বেঁচে থাকার প্রয়াস (অবশ্য আল্লাহপাকই পারেন বাঁচিয়ে রাখতে এবং সেই বিশ্বাস আছে)। এই সংক্রামক ব্যাধির ব্যাপকভাবে বিস্তার প্রতিরোধের অংশ হিসেবে মানুষ ঘরে ঘরে বসে আছে।

এখানে সামাজিকতা বন্ধ, কিন্তু মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ সৃষ্টির প্রথম থেকে সমাজবদ্ধভাবেই বসবাস করছে। আমি এর ব্যতিক্রম নই। আমি বরাবরই চাই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। কথা বলতে চাই। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। এখন ঘরে বসেই পোস্ট দেব, আল্লাহপাক যদি নেক–হায়াত দান করেন। ইতিমধ্যে বলে রাখা প্রয়োজন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইতালিতে মৃতের সংখ্যা ছিল ছয় শতাধিক আর আমি যেখান থেকে পোস্টগুলো দিচ্ছি, সেই ইংল্যান্ডে যদিও এখনো এই ভাইরাস সুনামি আকারে আসেনি, তারপরও গত ২৪ ঘণ্টায় ৫০ জনের মতো মানুষ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছে। হয়তো এই লন্ডন শহর সেই সুনামি থেকে সপ্তাহ দূরে। দুঃখজনক হলো, এই ভাইরাসে মৃত্যু হলে আত্মীয়স্বজনকে লাশ দেখতে দেওয়া হয় না।

কাজে না যেতে পারা কষ্টকর। ঘুম ভাঙলেই একটি হা–হুতাশ। তাড়াতাড়ি রেডি হতে হবে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, ডেডলাইন আছে, কোর্ট আছে ইত্যাদি। এসব অভ্যাস সহজে বদলানোর বিষয় নয়। এখন যদি কেউ ফোন করে কাজ দেন, তবে সেই কাজ করব। এখন যদি কেউ আইনি পরামর্শের জন্য ফোন করেন, তবে কোনো ফি ছাড়াই সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

করোনা নামের ভাইরাস চীনের পর পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে অনেক মানুষ এ ধরণি ছেড়ে চলে গেছে। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনো প্রতিকার আবিষ্কৃত হয়নি। এই ভাইরাস সম্পর্কে এখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের আগ্রহ। ইতিমধ্যে দুনিয়ার বড় বড় মহাশক্তিশালী রাষ্ট্র এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে আছে, কিন্তু তারা এ–ও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে এই যুদ্ধ একটি ইনভিজিবল (অদৃশ্য শত্রু বিরুদ্ধে যুদ্ধ)। আর আমরা জানি, যখন অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়, তখন বলাই বাহুল্য, সেই যুদ্ধ জয় করা দুরূহ। দুরূহ কেন বললাম! বলা উচিত ছিল, সেই যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়।

এখানে জীবন এখন থেমে আছে। এ এক অন্য জীবন। জীবনের এই অভিজ্ঞতা নিতে পারার মধ্যেও এক আনন্দ আছে। একটু ভিন্ন রকমের আনন্দ। বুকে কান্না, চোখে জল। এ রকম কিছু।

আমি জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে ব্রিটেনে এসেছিলাম। এসে সারা ব্রিটেন ঘুরে বেড়িয়েছি। ব্রিটেনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেছি। ব্রাইটন থেকে লিভারপুল এবং ব্রিস্টল থেকে নরউইচ, প্রতিটি সিটিতে ঘুরিয়ে বেড়িয়েছি। আর ডোবার হয়ে ইউরোপের দেশগুলো ভিজিটের কথা বললে এখনো অনেক বন্ধু আছেন, বলে বসবেন, মনে আছে সেই স্মৃতি, মনে আছে এই স্মৃতি ইত্যাদি। স্মৃতি সব সময় হয়তো হবে বেদনার, না হয় হবে মধুর, কিন্তু স্মৃতি তো স্মৃতিই। স্মৃতি ভুলার নয়, স্মৃতি ভুলে যায় না। সে ছিল ছাত্রজীবন, ছিল পড়ালেখার জীবন। সেই জীবন মানে দুরন্তপনা, সেই জীবন মানে অন্য রকম অনুভূতি, জীবন মানে রাতজাগা সময়, এরপর কর্মজীবন।

গত শুক্রবার সারা দিন ঘরে বসেই কাটিয়েছিলাম। এখন অন্য রকম সময় কাটাতে হবে। এখন ঘরে বসেই কাজকাম করতে হবে, বেঁচে থাকলে ঘরে বসে সময় কাটাতে হবে। এখন সোশ্যালাইজিং করতে হবে অনলাইনে।

জীবন যখন যেমন, সে রকমই জীবনকে মানিয়ে নিতে হবে। তা–ই না? চিন্তা করেন আমাদের বাল্যশিক্ষার কথা। আমরা এবং আমাদের গণ্ডি আমাদের পরিধি।

শুক্রবার ছিল জুমার দিন। জীবনে যে কখনো জুমার নামাজ মিস করিনি তেমন নয়, কিন্তু স্মৃতির খাতায় অনেক গভীরে গিয়ে কতগুলো জুমার নামাজ মিস করেছি, তা স্মরণ করতে পারছি না, কিন্তু যখনই কোনো জুমার নামাজ মিস করেছি, তা হয়তো কোনো অজুহাতে ছিল। মসজিদে নামাজ ঠিকই হয়েছে। আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনে কখনো শুনিনি মুফতি সাহেবেরা ফতোয়া দিয়ে নামাজ বন্ধ করতে। এই প্রথম। দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েই জীবন চলতে হয়। তো নামাজ না পড়েই ঘরে বসে বিষণ্ন সময় কাটাই। সকালে ফজরের নামাজ দিয়ে শুরু করেছিলাম। দুই–চারজন পূর্বপরিচিত ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ফোন আসে। এখন কারও সঙ্গে দেখা করতে ভয় হয়। নিজের জন্যই নয় শুধু, একজন লোক সংক্রামিত করছে ১০০ থেকে ২০০ লোককে। আবার সেই ২০০ সংক্রমিত করছে ২ হাজার লোককে। এভাবেই হাজারো লোক সংক্রমিত হচ্ছে। পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই।

আজ ঘুম থেকে উঠে ভেবেছিলাম একটু জগিংয়ে যাব, কিন্তু জগিংয়ে যেতেও ভয় হয়। একবার বলা হলো, এ রোগ বাতাসের মধ্য দিয়ে সংক্রমিত হয় না। আবার বলা হলো, বাতাসের মধ্য দিয়ে সংক্রমিত হয়। ভোরে জগিং করা আমার প্রিয় একটি কাজ, যা করতে পারলে নিজেকে সারা দিন হালকা লাগে। তা–ও করতে পারছি না।

আজ আমি ব্যথিত অনেক কারণে। এর অন্যতম কারণ হলো, আমরা যারা মুসলিম, আমরা কেমন করে স্বার্থপর হয়ে গেছি—আমরা বাঁচতে চাই। সে ভালো কথা। বাঁচতে সবাই চায়। চোখগুলো যতক্ষণ খোলা, ততক্ষণই দেখা যায় এই সুন্দর ধরণি। চোখ বন্ধ হয়ে গেলেই আর কিছু দেখা যায় না। সবই অন্ধকার, কিন্তু যারা খোলা চোখেও দেখতে পায় না, তাদের কী বলব। আমার চোখের সামনে দেখেছি, আমাদের মধ্যে যারা মুসলিম, যারা আমরা বড় বড় বুলি আওড়াই, তারাই সুপারমার্কেটগুলো যেন নিজের ট্রলিতে করে নিয়ে আসতে পারলেই বেঁচে যাই—এ রকমই একটি অনুভূতি। আমি দেখেছি, কীভাবে অন্য জাতির লোকেরা আমাদের এই অবস্থা দেখে নির্বাক চেয়ে চেয়ে দেখেছিল। আমরা মরে যাওয়াকে ভয় পাই, যেকোনো মূল্যে বাঁচতে চাই। আমরা অন্যকে হত্যা করে বেঁচে যেতে চাই।

আমি দেখেছি, একজন স্বাস্থ্যকর্মী কান্নায় ভেঙে পড়ে ভিডিওতে বলছেন, তিনি হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে কাজ করেন। মানুষকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করেন, কিন্তু সুপারমার্কেটে গিয়ে নিজের খাবারের জন্য একটু খাবারও তিনি পাননি। আমরা এ রকম হয়ে গেলাম কেন। আমরা কী জানি, যে খাবারদাবার কিনছি, সেগুলোও হয়তো আমরা উপভোগ করতে পারব না। (চলবে...)

*লেখক: ব্যারিস্টার

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0