গৃহবন্দীর জবানবন্দি-২

বিজ্ঞাপন
default-image

জীবন এখানে এখন কেমন, তা ভাষায় প্রকাশ করা অথবা ভাষায় বোঝানো দুরূহ। এ এক অনুভূতির বিষয়। রাস্তাঘাট, পার্কের ফটো তুলে দিলাম। জনশূন্য রাস্তাঘাট, দোকানপাট বন্ধ, জনমানবশূন্য পার্ক। লন্ডন শহর পরিত্যক্ত সিটির মতো। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। এ এক অন্য রকম নগরী। মানবশূন্য নগরী। যে লন্ডন শহর রাতেও জেগে থাকত। আজ তা দিবসের আলোতে অন্ধকার হয়ে আছে। শূন্যতা! চারদিকে হাহাকার। আত্মীয়স্বজন একে অন্যের খবর নিচ্ছেন টেলিফোনে। কিন্তু কেউ মারা গেলে নিকটাত্মীয় এসে দেখতেও পারবেন না, পারবেন না ভালোবাসার আপনজনকে জানাজা পড়ে চিরবিদায় দিতে।

চারদিকে লাশের খবর। রাতে শৃগালের বিলাপ। দিবসে শুধু কাকের কা কা ডাক। মাঝেমধ্যে দু-একটি ঘুঘুর ডাক। এখন এখানে ইংলিশ বসন্ত। সেই বসন্ত ফুল ড্যাফোডিল ফুটেছে। শুধু বসন্তের উল্লাস নেই। এখানে এখন রাত আর দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এখন জনমানবহীন পরিত্যক্ত বধ্যভূমির মতো। সন্তান তার পিতার কোলে আসছে না ভয়ে। পিতা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারছেন না। বৃদ্ধ পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানেরা দূরে থাকছে আর চোখের জল মুছছে গোপনে। প্রতি মুহূর্তে ভয়— এরপর কার পালা!

কেউ কথা বলছেন না। কথা বলছেন না স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে, মা পুত্রের সঙ্গে। কেউ কাউকে আদরে জড়িয়ে ধরতে পারছেন না, ভয় পাচ্ছেন। আতঙ্ক ! মহা আতঙ্ক ! কেয়ামতের মতো অবস্থা—ইয়া নাফছি, ইয়া নাফছি! নিজেকে নিজ গৃহে শৃঙ্খলিত করে রাখতে হয়েছে।

স্বাধীনতা অনেকখানিই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মানুষ তো কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন নয় এমনিতে। কখনোই ছিল না। আমরা সব সময়ই কিছুটা স্বাধীনতা উপভোগ করি! কিছুটা বিসর্জন দিই। মানুষ সব সময় ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্রের কাছে পরাধীন। রাষ্ট্র কিছুটা হলেও স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। সেগুলো রাষ্ট্র করে যদিও ব্যক্তি-সমাজের মঙ্গলের জন্য, কিন্তু তার পরও তো সংজ্ঞানুসারে আমরা স্বাধীন নই। আর মৃত্যুর কথা চিন্তা করেন! সেটি থাকার কারণে আমরা শৃঙ্খলিত সব সময়।

default-image

জীবনের সংজ্ঞা এখন নতুন করে দিতে হবে। জীবনকে এখন নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে। আমি এখন জীবনের অঙ্ক কষি। কিন্তু সরল অঙ্কের মতো কোথাও যেন গরমিল হয়ে গেছে মনে হয়। আমি রাতে বিহ্বলদৃষ্টিতে লন্ডন শহর দেখার চেষ্টা করি। আজ কি এই শহর সেই আগের মতোই আছে, নাকি অনেক খানি বদলে গেছে, বড়ই জানতে ইচ্ছে করে। মাঝেমধ্যে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে কোয়ারেন্টিন ভেঙে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তো হবে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষেধ আছে।

বুঝতে চেষ্টা করি, কেন আমরা আজ সবাই ভীত! আমরা কেন লুকিয়ে আছি। কার কাছ থেকে লুকিয়ে আছি। আদৌ কি লুকিয়ে থেকে আত্মরক্ষা করতে পারব! জীবন! পথিকের ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার কারণে এক সংক্ষিপ্ত বিরতি ছাড়া আর কিছুই না।

এতই সংক্ষিপ্ত এই যাত্রা! চিন্তা করুন একবার, যদি এই করোনাভাইরাসের ভিকটিম আমি-আমরা হয়ে যাই! কিছুই কি করার আছে। দুনিয়ার বড় বড় রথী-মহারথীরাই ধরাশায়ী। ভেবেছিলাম, এইতো একটু পরেই নিজেকে শুধরে নেব। এইতো কিছুদিন পরেই একটু সময় বের করতে পারব নিজের জন্য। নিজেকে নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করব। চেষ্টা করব সৃষ্টি এবং সৃষ্টিকর্তা নিয়ে ভাবতে। ভেবেছিলেম সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জীবনতরি গুটিয়ে নেব। খরস্রোতা নদীর ওপারে গিয়েই যখন প্রশান্ত কোনো নদীতে ডিঙি ঠেকে, তখনই একটু সামলে নেব নিজেকে। একটু গলা ছেড়ে গাইব জীবনের গান। গাইব মানুষের গান। গাইব মানবতার গান। কিন্তু বইঠা সোজা করে ধরার সময়টুকুও পেলাম না । জীবনের সময়গুলো খুবই অস্পষ্ট, আবছা আবছা। এ রকম কেন হলো। কেন হচ্ছে এত কৃত্রিম সবকিছু। কিছুতেই যেন স্তিমিত হচ্ছিল না। কোনো মতেই যেন ধীরগতিতে নিয়ে আসতে পারছিলাম না। কোনো অবস্থাতেই থামাতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম জীবনের দ্রুত সময়। কখনো ভাবিনি যে একসময় এতই স্তিমিত হয়ে যাবে। এখন রাস্তায় আগের মতো আর গাড়ি আর নেই। এখন আর অনবরত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হচ্ছে না। সবকিছুতেই ব্যালেন্স চলে আসছে।

default-image

সর্বশেষ দুটি ভালো খবর মানুষের চোখে ঝলক নিয়ে আসছে। মানুষ আশার আলো দেখতে পাচ্ছে টানেলের অপর প্রান্তে। এক চীনের হুবেই প্রদেশে, যেখান থেকে এই করোনা ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হয়েছিল, এখন আর কেউ আক্রান্ত হচ্ছে না। আরেকটি সংবাদ শুনে চোখের কোনায় এক ফোঁটা জল এসে থেমে আছে। আনন্দাশ্রু। এই দেশের সরকার ঘোষণা দিয়েছিল সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (NHS) স্বেচ্ছাসেবী আবশ্যক। ২৪ ঘণ্টা পেরুতে না পেরুতে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। কিছুদিন আগে ৬০ হাজার রিটায়ার্ড চিকিৎসক ও নার্স ফিরে এসেছিলেন আবার কাজ করতে হসপিটালগুলোতে। এখন ১ লাখ ৭০ হাজার সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসেছেন মৃত্যু নির্ঘাত জেনেও। মানুষ এখনো ভালোবাসে। মানুষ এখনো নিজের জীবন দেয় মানবতার কল্যাণে। মানুষ এখনো এগিয়ে আসে মৃত্যুবরণ করে মৃত্যুকে জয় করতে। (চলবে)

*লেখক: ব্যারিস্টার

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন