করোনা মোকাবিলা

চীন, রাশিয়া ও ভারতের টিকা পাওয়ার চেষ্টা

■ চীন থেকে বিনা মূল্যে ১ লাখ ১০ হাজার টিকা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও টিকা কেনায় অগ্রাধিকার।

■ রাশিয়া থেকে প্রতি টিকা ১০ ডলারে পাওয়ার সম্ভাবনা।

■ ভারত থেকে টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার।

বিজ্ঞাপন
default-image

চীনা কোম্পানি সিনোভেকের টিকা দেশে পৌঁছালেই পরীক্ষামূলক প্রয়োগ (ট্রায়াল) শুরু করবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে টিকা আনতে দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সর্বশেষ ভারতের বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড বাংলাদেশে তাদের টিকার পরীক্ষা করার আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিশ্বের কিছু দেশ করোনার টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছে। যেসব দেশ নিজেরা টিকা উদ্ভাবন বা উৎপাদন করতে পারবে না, তাদের অন্য দেশ থেকে টিকা কিনতে হবে অথবা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চীন, রাশিয়া, ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে টিকা আনার সম্ভাব্য বিকল্প পথ খুঁজে দেখছে। কোভ্যাক্সের মাধ্যমে টিকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায়ও বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনার ভ্যাকসিনের জন্য টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব দেশে আবেদন করে রাখা হয়েছে। যেখানেই আগে পাওয়া যাবে, দেশের মানুষের জন্য টিকা আনা হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হালনাগাদ তালিকা বলছে, বিভিন্ন দেশে ১৭৯টি পৃথক টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে ১৪৫টি আছে প্রাথমিক পর্যায়ে এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে ৩৪টি। ১২ আগস্ট রাশিয়া যে টিকার সফলতার ঘোষণা দিয়েছিল, তালিকায় তার নাম নেই। তবে রাশিয়ার টিকার ব্যাপারে ইতিমধ্যে অনেক দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশও দেখিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চীনা টিকা

বাংলাদেশ সরকার চীনের কোম্পানি সিনোভ্যাকের টিকা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে। আইসিডিডিআরবি এই পরীক্ষা করবে। ট্রায়ালের প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. কে জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। চীনা কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলেই টিকা বাংলাদেশে পৌঁছাবে। আমরা ট্রায়াল শুরু করে দেব।’

ঠিক কবে নাগাদ পরীক্ষার টিকা বাংলাদেশে পৌঁছাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না আইসিডিডিআরবি। তবে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

রাজধানীর সাতটি হাসপাতালে ৪ হাজার ২০০ স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর চীনা টিকার পরীক্ষা হবে। আইসিডিডিআরবি এরই মধ্যে প্রায় ২৫০ মাঠ গবেষক নিয়োগ দিয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণ চলছে। আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ সাতটি হাসপাতালে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরীক্ষার প্রাথমিক প্রস্তুতির ব্যাপারেও কথা বলে এসেছে। হাসপাতালগুলো হচ্ছে: মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিট-১, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইউনিট-২ এবং ঢাকা মহানগর হাসপাতাল।

আইসিডিডিআরবির সঙ্গে সিনোভ্যাকের চুক্তিতে বলা আছে, পরীক্ষায় নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হলে সিনোভ্যাক ১ লাখ ১০ হাজার টিকা বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে দেবে। এ ছাড়া টিকা তৈরির প্রযুক্তিও বাংলাদেশকে দেওয়ার কথা আছে।

সিনোভ্যাকের এই টিকার নাম ‘করোনাভ্যাক’। ইতিমধ্যে ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ায় করোনাভ্যাকের পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাশিয়ার টিকা

টিকা উদ্ভাবনের ঘটনায় অনেকটা আকস্মিকভাবে রাশিয়া আলোচনায় চলে আসে। ১২ আগস্ট রাশিয়া টিকা উদ্ভাবনের ঘোষণা দেয়। তবে রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। তবে ৪ সেপ্টেম্বর চিকিৎসা সাময়িক ল্যানসেট–এ রাশিয়ার টিকা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশের পর আলোচনা অনেকটাই থেমে গেছে।

একাধিক সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার কাছে থেকে টিকা পাওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেছে। ২৮ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, রাশিয়ার এক একটি টিকার দাম পড়বে ১০ মার্কিন ডলার বা ৮৫০ টাকা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উদ্ভাবন ও উৎপাদনে ভারত

ভারত একই সঙ্গে টিকা উদ্ভাবন এবং অন্য দেশের উদ্ভাবিত টিকা উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরের সময় প্রতিবেশী দেশটির কাছ থেকে টিকা সহায়তার কথা প্রথম শোনা যায়।

সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া টিকা উৎপাদনের চুক্তি করেছে অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রোজেনেকার সঙ্গে। আবার সেরামের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মা। তবে সেরামের টিকা বাংলাদেশে বিনা মূল্যে না স্বল্প মূল্যে পাওয়া যাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে ভারতের বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড বাংলাদেশে তাদের টিকার পরীক্ষার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা প্রাথমিক আলোচনাও করেছে। আনুষ্ঠানিক বা লিখিত প্রস্তাব তারা এখনো দেয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (সেবা বিভাগ) আবদুল মান্নান গতকাল প্রথম আলোকে বলেছেন, ভারতের ওই প্রতিষ্ঠান টিকা পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলে তারও অনুমোদন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য সব রকম উপায়ে আমরা টিকা পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। দেশে চীনের টিকার ট্রায়াল শুরু হতে যাচ্ছে। রাশিয়ার টিকা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নেতৃত্বে ইউনিসেফ

দরিদ্র দেশের মানুষের টিকার চাহিদা মেটানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দ্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) ও কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (সিইপিআই) যৌথভাবে একটি উদ্যোগ গড়ে তুলেছে। এর নাম: কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস বা কোভ্যাক্স। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনা মূল্যে, স্বল্প মূল্যে টিকা কিনে মজুত গড়ে তুলবে কোভ্যাক্স। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভ্যাক্সের টিকা পাওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। কোভ্যাক্সের টিকা যৌক্তিকভাবে বিশ্বব্যাপী বণ্টনে নেতৃত্ব দেবে ইউনিসেফ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হঠাৎ হতাশা

উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় আলোচনার শীর্ষে রয়েছে অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা। একাধিক দেশে এই টিকার পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একজনের স্পাইনাল কর্ডে সমস্যা দেখা দেওয়ায় পুরো পরীক্ষা এখন স্থগিত করা হয়েছে। ভারতে এই পরীক্ষা চলছিল সেরাম ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে। গতকাল ভারতেও পরীক্ষা স্থগিত করেছেন সেরামের গবেষকেরা।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকার পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় বিজ্ঞানী, রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। ওই টিকার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা বলেছেন, টিকা উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় স্থগিতের এমন ঘটনা স্বাভাবিক। খুব শিগগির পরীক্ষা আবার শুরু হবে।

আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন চিকিৎসা সাময়িকী ও বিদেশি গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, করোনা মোকাবিলায় পুরোনো প্রযুক্তির পাশাপাশি সম্পূর্ণ নতুন ছয়টি প্রযুক্তি ব্যবহার করে টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত টিকার সফলতা নিয়ে শুরু থেকেই বিজ্ঞানীদের একটি অংশের সংশয় আছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের মডার্নার টিকা নতুন প্রযুক্তির। অন্যদিকে সিনোভ্যাক বা ভারতের বায়োটেক পরীক্ষিত প্রযুক্তির মাধ্যমে টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অতীতে দেখা দেছে, টিকা উদ্ভাবনে বছরের পর বছর সময় লাগে। টিকা নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে চান। কিন্তু অর্থনীতি ও রাজনীতির চাপ থাকে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগেই কার্যকর টিকা বাজারে আসবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের পরিচালক ফ্রান্সিস কোলিন্স ৯ সেপ্টেম্বর শুনানির সময় সিনেট কমিটিকে বলেছেন, পুরোপুরি বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে টিকা আসতে হবে, তা না হলে ‘আমি তার সঙ্গে থাকব না’।

অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ ৯টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, করোনা টিকার উদ্ভাবন ও পরীক্ষায় উচ্চ নৈতিকতা ও সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক নীতি অনুসরণ করতে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে: যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রোজেনেকা ও গ্লাক্সোস্মিথ, জার্মানির বায়োনটেক, জনসন অ্যান্ড জনসন, এমএসডি, মডার্না, নোভাভ্যাক্স ও ফাইজার এবং ফ্রান্সের স্যানোফি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন