রাজধানীর শ্যামবাজারে ছিল মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেও অনেকেই মাস্ক পরেননি। গতকাল দুপুরে
রাজধানীর শ্যামবাজারে ছিল মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেও অনেকেই মাস্ক পরেননি। গতকাল দুপুরেছবি: দীপু মালাকার

মার্চের শেষ দুই সপ্তাহের শনাক্তের হার বিবেচনা করে ঢাকার বাইরের ৩৭টি জেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। সেই ৩৭ জেলার গত ১৫ দিনের করোনা শনাক্তের হার ও প্রস্তুতি নিয়ে খোঁজ করেছেন প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা। তাতে দেখা গেছে, জেলাগুলোতে মহামারি মোকাবিলায় তেমন জোরদার কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। জেলাগুলোর হাসপাতালগুলোও সেভাবে প্রস্তুত নয়। এমনকি কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশনও সেভাবে মানা হচ্ছে না। করা হচ্ছে না কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং। জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষকে আটকে রাখা যাচ্ছে না, তাঁরা স্বাস্থ্যবিধিও মানছেন না। এটা ভালো ফল বয়ে আনবে না।

১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৩২ হাজার ১৫৩ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে ৫ হাজার ৭৯২ জনের। শনাক্তের হার ১৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এ সময়ে মারা গেছেন ৪৮ জন। শনাক্তের উচ্চ হারেও চট্টগ্রামে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রথম দিকে আক্রান্তদের সঙ্গে ফোনে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে যোগাযোগ করা হতো। এখন তা সব সময় করা হয় না। বিদেশ থেকে আগতদের কোয়ারেন্টিনের জন্য দুটি হোটেল নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া জানান। তিনি বলেন, তাঁদের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে এলে কোয়ারেন্টিন থেকে বাসায় যেতে পারবেন। তবে কার্যত ওই দুই হোটেলে সেভাবে কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে না বলে হোটেল সূত্র জানায়। অনেকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকবেন বলে চলে গেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

সিলেটেও করোনা সংক্রমণের উচ্চ হার। গত ১৫ দিনে এই জেলায় ১১ হাজার ৭২৫ জন নমুনা পরীক্ষার জন্য দিয়েছেন, শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৫১ জনের। এই সময়ের মধ্যে জেলায় মারা গেছেন ১৪ জন। তবে প্রকোপ ঠেকাতে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত এবং উপসর্গ থাকা রোগীদের ভর্তির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। মধ্যখানে বন্ধ থাকা একটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা চিকিৎসার জন্য ১০০ শয্যা বর্ধিত করে ২০০ শয্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন কার্যকর কিংবা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের কড়াকড়ি নেই।

বগুড়ায় গত ১৫ দিনে ৩ হাজার ২৪৫ জন নমুনা দিয়েছেন, শনাক্ত হয়েছে ৭৫৬ জনের। তবে জেলায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন সেন্টার চালু নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা খুব কম। ঢিলেঢালা লকডাউনে শহরের রাস্তায়, বাজারে মানুষের ঢল। এর ফলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। জেলার তিনটি বড় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

default-image

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটে ৬২টি সাধারণ শয্যা এবং ১৩টি আইসিইউ মিলে ৭৫টি শয্যা আছে। এখানে বর্তমানে করোনার রোগী ভর্তি ৮১ জন।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে করোনা রোগীর জন্য ৫০টি সাধারণ শয্যা এবং ৮টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। রোগী ভর্তি আছেন এখানে ৪৬ জন। হাসপাতালে নেই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ, নেই করোনা পরীক্ষার জন্য কোনো আরটি–পিসিআর ল্যাবরেটরি। করোনা রোগীদের ফুসফুস পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে জরুরি ডিজিটাল এক্স–রে যন্ত্র নেই এখানে। নেই সিটি স্ক্যান বা এমআরআই যন্ত্র। উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন সরবরাহের জন্য নেই হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা। টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ৫০টি সাধারণ শয্যা, ৫টি আইসিইউ রয়েছে। এখানে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪৮ জন।

কুমিল্লায় আক্রান্ত ও মৃতদের বেশির ভাগই শহরের মানুষ। এবার আক্রান্তরা সুস্থও হচ্ছেন দেরিতে। এরপরেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কুমিল্লার সিভিল সার্জন মীর মোবারক হোসাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা সত্ত্বেও মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না।

বিজ্ঞাপন
default-image

মার্চের শেষ দুই সপ্তাহের শনাক্তের হার বিবেচনায় নরসিংদী জেলাকেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল আইইডিসিআর। এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহেও এ জেলায় সংক্রমণ পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ১–১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই ১৫ দিনে মোট ১ হাজার ৬৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ৪৬৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এ জেলায় আলাদা করে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি স্বাস্থ্য বিভাগকে। করোনায় আক্রান্ত রোগীর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করা হচ্ছে শুধু তাঁদের, যাঁদের শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। যাঁরা সংকটাপন্ন, শুধু তাঁদের কোভিড ডেডিকেটেড নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি রেখে আইসোলেশনে রাখা হয়। কোয়ারেন্টিন ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, তা সঠিক পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে নেই স্বাস্থ্য বিভাগের।

প্রবাসী অধ্যুষিত উচ্চ ঝুঁকির জেলা হিসেবে মাদারীপুরকে চিহ্নিত করা হয়। লকডাউনের শুরুটাও এ জেলায়। এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে জেলায় সংক্রমণ বাড়লেও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, কোয়ারেন্টিন ঠিকঠাক হচ্ছে না। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির পরিবার ও প্রতিবেশী সদস্যদের কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হলেও তাঁরা কেউ তা মানছেন না।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন