বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাসপাতালে আনার পর পেট ও ফুসফুসে পানি চলে আসে। তা ভালোও হয়ে যায় বলে জানান তাহমিনা আক্তার। তিনি আজ শুক্রবার বলেন, ‘আস্তে আস্তে ডেঙ্গুর উপসর্গগুলো কমে আসে। রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন ভালোর দিকে এসেছে। তবে বমি কমেনি। তখন ডাক্তার কী এক সন্দেহ থেকে কোভিডের পরীক্ষা দিলেন। তখন পরীক্ষায় ধরা পড়ল, কোভিড হয়েছে। অনেক আগে হয়েছিল, সেই জীবাণুটা এসে হৃৎপিণ্ডে আক্রমণ করেছে। হার্টে (হৃৎপিণ্ড) বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।’

রেদওয়ান ইবনে জোহার এ অবস্থাকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় ‘মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিনড্রোম ইন চিলড্রেন’ (এমআইএসসি)। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণেই এই শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।

চিকিৎসকেরা বলছেন, বাংলাদেশে চলতি বছরের মার্চে গবেষণার উদ্দেশ্যে করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই এমআইএসসি শনাক্ত হয়। দেশে করোনার ডেলটা ধরনের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই শিশুদের মধ্যে এসব জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে ধারণা তাদের।

২৩ অক্টোবর যখন কথা হচ্ছিল তাহমিনা আক্তারের সঙ্গে, তখন রেদওয়ান ইবনে জোহার হাসপাতালে ৯ দিন হয়ে গেছে। চিকিৎসার পর তখন সে অনেকটাই সুস্থ। সেদিন ইউনিভার্সাল মেডিকেল হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি ছিল আরও ৯টি শিশু। এর মধ্যে একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও এমআইএসসি ছিল দুজনের।

অপর শিশুটি ১০ মাস বয়সী, আলিফ আহমেদ। নাকে নল ঢোকানো ছিল। শিশুটির মা শামসুন্নাহার মণি প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে জ্বর ছিল অনেক এবং ঘাড় বাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। পরে হঠাৎ জ্বর আসে। এর বেশি আর কথা বলতে পারেননি শামসুন্নাহার মণি, ব্যথায় কাতর সন্তানের অনবরত কান্নার কারণে থেমে যেতে হয় তাঁকে।

ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) দায়িত্বে রয়েছেন চিকিৎসক অধ্যাপক মোহাম্মাদ মনির হোসেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালের পিআইসিইউর দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। পিআইসিইউ সেবাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ তিনি।

অধ্যাপক মোহাম্মাদ মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দুই হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও কোভিড মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিনড্রোম ইন চিলড্রেন (এমআইএসসি) ছিল। অর্থাৎ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সময় এই শিশুদের এমআইএসসি জটিলতা ছিল। এমআইএসসি করোনাকালেও হতে পারে, করোনার পরপরও হতে পারে।

সম্প্রতি ৫০টির বেশি শিশুর ছবি তাঁর ফেসবুকে দিয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মাদ মনির হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই শিশুদের সবাই অস্বাভাবিক রক্তচাপ নিয়ে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিআইসিইউয়ে ভর্তি ছিল। জটিলতার কারণে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে তাঁদের ইউনিভার্সালের পিআইসিইউতে পাঠানো হয়েছিল।’

অধ্যাপক মনির হোসেন জানান, বিভিন্ন সময়ে ভর্তি হওয়া এই শিশুদের ওজন বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এমনকি ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুর ওজন ৫০ থেকে ৬০ কেজিও দেখা গেছে। অসুস্থতার কারণে এদের অনেকেরই ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন ছিল।

এই শিশুদের সেরে ওঠাকে ‘অলৌকিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘আমাদের এসব রোগীর জ্বরের মাত্রাটা যখন বেশি ছিল, বেশি দিন ধরে জ্বর ছিল, তখন সন্দেহ হয়েছে কিছু কিছু উপসর্গ দেখে। যেমন শিশুর হৃৎপিণ্ড সংক্রমিত হয়েছে। তখন আমরা বুঝেছি যে শিশুদের এমআইএসসি হচ্ছে।’

এমআইএসসি কী

চিকিৎসক অধ্যাপক মনির হোসেন বলেন, শিশুরা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হলে উপসর্গগুলো সব সময় সাধারণ উপসর্গের মতো হয় না। তখন এটা এমআইএসসি বা শারীরিক জটিলতা হিসেবে হৃৎপিণ্ড, শিরায় আক্রমণ করে। জ্বর আসে ও মুখে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। হৃৎপিণ্ড অনেকটা অকার্যকর হয়ে যায়।

এই জটিলতা বা সমস্যাগুলোকে কাওয়াসাকি লাইক সিনড্রোম বলা হয়, অর্থাৎ কাওয়াসাকি নামের একটি রোগের উপসর্গের মতো।

default-image

করোনাভাইরাসের কারণে শিশুদের মধ্যে কাওয়াসাকির মতো উপসর্গ প্রথম দেখা যায় ইংল্যান্ডে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুসারে, কাওয়াসাকি রোগ কাওয়াসাকি উপসর্গ হিসেবেও পরিচিত। এটি একধরনের তীব্র জ্বরের অসুস্থতা, যার কারণ জানা যায়নি।

প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের এটি আক্রান্ত করে। রোগটির কথা ১৯৬৭ সালে জাপানে প্রথম আলোচিত হয়। প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে রাজ্যে। রোগটির উপসর্গগুলো হলো জ্বর, র‍্যাশ ওঠা, হাত–পা ফুলে যাওয়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং মুখ, ঠোঁট ও কণ্ঠনালিতে জ্বালাপোড়া করা।

যেভাবে শনাক্ত হলো দেশে

আগে স্বল্প পরিসরে প্রত্যক্ষ হলেও বাংলাদেশে করোনার ডেলটা ধরনের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে শিশুদের মধ্যে এই জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মাদ মনির হোসেন।

অধ্যাপক মোহাম্মাদ মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মূলত অ্যান্টিবডি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই এমআইএসসির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আগে দেশে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অনুমতি ছিল না। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ থেকে শুধু গবেষণার উদ্দেশ্যে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তে দুই ধরনের পরীক্ষা হচ্ছে দেশে। এর একটি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার পর যে অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়, তা পরীক্ষা করেই বোঝা যায় যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত এসব শিশুর অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। তবে এ বিষয়ে আইইডিসিআরে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্যগুলো পাওয়া যায়নি।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন