default-image

কোভিড-১৯ রোগের কারণ কোভি-১৯ ভাইরাস, যা চীনের উহান শহর থেকে বিশ্বের ১২৪টি দেশে ছাড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে এ ভাইরাসটি আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে আতঙ্কিত হওয়া না-হওয়া নিয়েও একধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেকেই কোভিড-১৯ রোগটিকে মৌসুমি ফ্লুর সঙ্গে তুলনা করে এর ভয়াবহতা মারাত্মক নয় বলছেন, একই সময়ে আবার কেউ কেউ রোগটিকে সার্স বা মার্সের সঙ্গে তুলনা করে এর ভয়াবহতা খুব ধ্বংসাত্মক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

পরিসংখ্যান অনুপাতে, সার্সে মৃত্যুর হার ছিল ১০ শতাংশ, মার্সে ৩৪ শতাংশ, মৌসুমি ফ্লুতে শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ এবং ইবোলা রোগে আফ্রিকায় মৃত্যুর হার ছিল ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চীনে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

এর মানে হচ্ছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণকে সার্স বা মার্সের মতো ভয়ংকর ভাবা যেমন উচিত নয়, তেমনিভাবে মৌসুমি ফ্লুর সঙ্গে মিলিয়ে হালকাভাবে দেখারও অবকাশ নেই। একজন সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার কাছে কোভিড-১৯ রোগটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ আছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে যে রোগটির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণ করার চাবি মানুষের হাতেই আছে, আর এই চাবিটাও আছে রোগটিকে ভয় পাওয়ার মধ্যেই।

কোভিড-১৯ রোগটির সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্রটা বুঝতে পারলেই জানা যাবে এর ভয়াবহতা কমানোর চাবিকাঠি কী। ১২ মার্চের জাপান সময় বিকেল চারটা (GMT 11 AM) পর্যন্ত চীনে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার ৭৯৬, যার ৫ শতাংশ ছিল গুরুতর অসুস্থ রোগী। তাদের চিকিৎসায় কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রসহ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের আরও অনেক রকমের জীবনসহায়ক সাপোর্টের প্রয়োজন হয়েছে। আর তা সময়মতো দিতে পারা না–পারার ওপরে নির্ভর করে ঘটেছে মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, বেড়েছে ভয়াবহতা আর আতঙ্ক।

কোভিড-১৯ রোগটির উপসর্গ, লক্ষণ বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জটিলতার কোনোটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন নয়। চিকিৎসকেরাও এই রোগের লক্ষণ বা জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিপক্ব। শুধু অভাবটা হচ্ছে একই সময়ে অনেক রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সাপোর্টগুলো দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে। এ কারণেই উহানে জটিল রোগীদের একটা বড় অংশ, যা কিনা মোট আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৪ শতাংশ, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে।

বর্তমান সময়ে যে দেশে এ রোগ সবচেয়ে বেশি হারে সংক্রমিত হচ্ছে, সেটা হচ্ছে ইতালি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালিতে কোভিড-১৯–এ আক্রান্তদের মধ্যে ৮ শতাংশ গুরুতর অসুস্থতার এবং ৬.৩ শতাংশ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে। তার মানে হচ্ছে যে একসঙ্গে যদি অনেকগুলো গুরুতর অসুস্থ রোগী হাসপাতালে চলে আসে, সে ক্ষেত্রে সবাইকে একসঙ্গে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয় না এবং তখনই তাদের মধ্য থেকে একটা বড় অংশ মারা যাচ্ছে। এটাই কিন্তু বাস্তবতা। সব দেশেই এত রোগী মারা যাচ্ছে মূলত এই কারণেই। কোনো দেশের পক্ষেই এত ব্যয়বহুল আর কষ্টসাধ্য জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা অজানাসংখ্যক রোগীর জন্য প্রস্তুত করে রাখা সম্ভব নয়। যেটা সম্ভব, তা হচ্ছে ভাইরাসের সংক্রমণকে রোধ করা। আক্রান্তের হার কমাতে পারলেই মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।

মানুষের আতঙ্ককে সচেতনতায় রূপান্তর করতে পারাটাই রোগ সংক্রমণ রোধের মূল চাবিকাঠি। আর এটা সম্ভব মানুষের সামনে মহামারির প্রকৃত তথ্য–উপাত্ত এবং তাদের করণীয় তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে। এ প্রসঙ্গে জাপান সরকারের পদক্ষেপ উল্লেখ করা যেতে পারে।

করোনাভাইরাসজনিত রোগের মহামারির ঘটনা এর আগে এশিয়ার কয়েকটি দেশে থাকলেও জাপানে কখনোই ছিল না। জাপানে আমার একজন সহকর্মী অধ্যাপক ইয়াসুকি কাতো গত ২৯ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস–এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে জাপানের অভিজ্ঞতা না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। জাপানে কোভিড-১৯–এর উপস্থিতি দেখা গেছে ১৬ জানুয়ারি। জাপান সরকার চীনে কোভি-১৯ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া এবং চীনের পদক্ষেপগুলো পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নিয়েছে।

২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে উহানে এবং ৩১ ডিসেম্বর থেকে উহানের বাইরে চীনের অন্যান্য প্রদেশে ভাইরাস সংক্রমণের হার দ্রুত বাড়তে থাকে। এ বছরের ২৩ জানুয়ারি উহান লকডাউন করা হয়। উহানের বাইরের প্রদেশগুলোতে পঞ্চম দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৭ জানুয়ারি থেকে সংক্রমণের হার কমতে দেখা যায়।

এসব তথ্য মাথায় রেখে জাপান সরকার কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পরপরই তার দেশের জনগণের সামনে গ্রাফ আকারে একটি চিত্র তুলে ধরে। সেখানে তারা দেখায় যে জাপানের পার্শ্ববর্তী দেশে যে অনুপাতে এ রোগটি ছড়িয়েছে, সেভাবে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতিটা কী হতে পারে। কী সংখ্যক আশঙ্কাজনক রোগী হতে পারে এবং কী পরিমাণ রোগীকে সাপোর্ট দেওয়ার মতো সক্ষমতা আছে। এই চিত্রটা জনগণের কাছে তুলে ধরার প্রায় সমসাময়িক সময়ে সরকার দেশব্যাপী সব স্কুল-কলেজ দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে যাদের বাসায় থেকে অনলাইনে অফিশিয়াল কাজ করা সম্ভব, তাদের বাসা থেকে কাজগুলো করার জন্য আহ্বান করে। অর্থাৎ সরকার এই রোগটি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, এ জন্য ব্যবস্থা নেয় এবং জনগণকে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানায়। জাপান সরকার এ তথ্য-উপাত্ত জনগণের সামনে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে এবং গৃহীত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তার জনগণের ভয়কে পজিটিভলি করোনাভাইরাস সংক্রমণ সচেতনতায় কাজে লাগিয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ কোভিড-১৯ মহামারি সীমিত রাখতে সফল হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এই রোগের সংক্রমণ সীমিত রাখতে সরকার অন্য আক্রান্ত দেশগুলোর পরিস্থিতি এবং পদক্ষেপগুলোকে আমলে নিয়ে জনগণকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন বলে আশা রাখি।

গত ১০০ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে বেশ কয়েকটি সংক্রমণ মহামারি আকারে এসেছে এবং ভবিষ্যতে আসাটাও স্বাভাবিক। বর্তমান সভ্যতার অনন্ত উচ্চ লক্ষ্য আরও উচ্চমাত্রার মহামারি ডেকে আনতে পারে। মনে করা হয় যে খুব কাছাকাছি ভবিষ্যতে সংক্রমণই হবে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ। তাই গবেষকেরা ভবিষ্যৎ সংক্রমণ মোকাবিলায় কোনো দেশের প্রস্তুতি ব্যবস্থাপনা নিরূপণের জন্য কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। এটাকে বলা হয় Infectious Diseases Vulnerability Index (IDVI)। এই সূচকের মাধ্যমে কোনো একটা দেশ সংক্রমণ রোগ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত বা সক্ষম, তা পরিমাপ করা যায়। জাপানের IDVI সূচক শূন্য দশমিক ৯২৬ (সূচক স্কেল ০ থেকে ১)।

বর্তমান মহামারিটি একসময় শেষ হবে, কিন্তু ভবিষ্যতে আরও কোনো মহামারি আসার আশঙ্কা শেষ হবে না। তাই আশা করি বাংলাদেশও অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সংক্রমণ রোগ মোকাবিলায় নিজের সক্ষমতাকে বাড়াবে।

*লেখক, সহকারী অধ্যাপক, সংক্রমণ রোগতত্ত্ব বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব হেলথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার, জাপান ও অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া এবং নিবিড় পরিচর্যা মেডিসিন বিভাগ, বিএসএমএমইউ, বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন