default-image

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সবার জীবন মহাদুর্যোগের মুখোমুখি। এই কঠিন দুঃসময়ে সর্বাধিক সংকটে নিপতিত দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠির কথা আমরা মনে হয় ভুলেই বসে আছি; তাঁদের দুঃখ, দুর্দশা, অসহায়ত্ব, কোনও কিছুই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে বলে মনে হয় না।

দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটির মতো প্রবীণ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ১-২ শতাংশ পেনশন সুবিধা ভোগ করে থাকেন। বাকিরা বেঁচে থাকার জন্য হয় নিজস্ব সম্পদ ও সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল নতুবা সন্তানই তাঁদের একমাত্র ভরসা। দেশে খুব কমসংখ্যক প্রবীণই রয়েছেন, যাঁরা নিজের সম্পদ বা সঞ্চয় দিয়ে চলতে পারার মতো সৌভাগ্যবান। বিআইডিএসের এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রামবাংলায় দুই-তৃতীয়াংশের মতো প্রবীণ দারিদ্রের মধ্যে বসবাস করেন—যাঁদের নিজস্ব সহায়–সম্বল বলে তেমন কিছুই নেই।

জীবন ধারণের এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান দুঃসময়ে দেশের প্রবীণ জনগণ যে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে সর্বাধিক সংকটের মুখোমুখি হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। সন্তানদের নিজেদের জীবন-জীবিকাই যেখানে টালমাটাল এবং সীমাহীন অনিশ্চয়তায় আছন্ন, তখন ইচ্ছা থাকলেও দিশেহারা সন্তানেরা প্রবীণ পিতা–মাতার দায়িত্ব কতটা বহন করতে পারছে বা পারবে, তাতে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তো এই চ্যালেঞ্জের মাত্রা চরম। উপরন্তু, প্রবীণদের একটি অংশ শারিরীক-মানসিকভাবে অক্ষম বা আংশিকভাবে অক্ষম থাকেন। একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি নানা রকম রোগব্যাধিতে আক্রান্ত থাকেন। বর্তমান সংকটকালে এসব কিছুও পরিবারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে সন্তান এবং নির্ভরশীল পিতা–মাতার মধ্যকার সম্পর্ক যে আরেকটু জটিল এবং কঠিন করে তুলতে পারে, সেটিও অনুমান করা যায়। তাই বর্তমান সময়ে প্রবীণ পিতা–মাতার প্রতি পারিবারিক নির্যাতন, নিপীড়ন এবং নিষ্ঠুরতার মাত্রাও খানিকটা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে করোনা সন্দেহে প্রবীণ পিতা–মাতার প্রতি সন্তানের নির্মম ব্যবহারের কথা আমরা জানতেও পেরেছি। সর্বোপরি, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সমাজেও নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, যার ফলে যৌথ পরিবার দ্রুত আবেদন হারাচ্ছে এবং একক পরিবারের গুরুত্ব বাড়ছে। পরিবার এখন সীমিত হয়ে আসছে স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানের মধ্যে; পিতা–মাতা অনেক সময়ই থেকে যান অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে। বিআইডিএসের জরিপে দেখা গেছে, গ্রামবাংলায় প্রায় এক-চর্তুথাংশ বা তারও বেশি প্রবীণ বর্তমানে হয় একাকী অথবা কেবল স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে একত্রে বসবাস করছেন; সন্তানেরা থাকছেন পৃথক খানায়। যদিও তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশ বসবাস করেন একই আঙিনায়।

সব মিলিয়ে বর্তমান দুর্যোগময় মুহূর্তে দেশের প্রবীণ জনগণ শুধু যে অধিক করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে কিংবা এই রোগ থেকে অধিক মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছেন তাই-ই নয়, জীবন বাঁচানোর যুদ্ধেও তাঁরা সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবার সংকট, জীবন বাঁচানোর সংকট সবই এখন সব শ্রেণীর, সব বয়সের মানুষের চেয়ে প্রকট।

প্রবীণদের এই সংকটকে সামনে রেখে আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আজকের উন্নত ও অগ্রসরমাণ বাংলাদেশ, যার জন্য আমরা গৌরব বোধ করি এবং যার সুবিধা আমরা ভোগ করছি, এটি প্রবীণদের বিগত দিনের ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং পরিশ্রমেরই ফসল। তাঁদের পরিশ্রম ও ত্যাগের কারণেই আজকের বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি। প্রকৃতির নিয়মেই তাঁদের বার্ধক্য এবং বার্ধক্যের অসহায়ত্ব বরণ করতে হয়েছে। এটি তাঁদের কোনো ভুল বা পাপের ফসল নয়, এমনকি তাঁদের কোনো ইচ্ছাকৃত অবস্থানও নয়। তাই দেশের দেড় কোটি প্রবীণের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন রাখতে চাই, এই দুঃসময়ে প্রবীণদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। তাঁদের জন্য সর্বজনীন বয়স্ক ভাতা প্রবর্তন করুন, যাতে দেশের সব প্রবীণ জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে অবলম্বন খুঁজে পান। দুর্ভোগ-দুর্দশার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন এবং সমাজ ও আপনজনদের নির্মমতা-নিষ্ঠুরতা থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন।

করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকার সম্প্রতি পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় যে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছে, তাতে দেশের সর্বাধিক দারিদ্রপ্রবণ ১০০টি উপজেলায় বয়স্ক ভাতা শতভাগে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা সে জন্য সরকার এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিশেষ কৃতজ্ঞ। কিন্তু দেশের সব উপজেলার জন্যই আমরা এই নির্দেশনা দাবি করছি, যাতে সব এলাকার সব প্রবীণ এই সংকটকালে অসহায় না থাকেন।

আমরা স্মরণ করতে চাই ১৯৯৮ সালে বর্তমান সরকার তার প্রথম মেয়াদে দরিদ্র অসহায় প্রবীণদের দুর্দশা লাঘবে দেশে প্রথমবারের মতো বয়স্ক ভাতা চালু করেছিল। বর্তমান ক্রান্তিকালে সেই বয়স্ক ভাতাকে সর্বজনীন রূপদান করে সরকার প্রবীণদের প্রতি আবার তার মহানুভবতার স্বাক্ষর রাখবে বলে বিশ্বাস রাখছি। করোনার প্রভাবে সৃষ্ট বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ভবিষ্যতে আরও কঠোর এবং দীর্ঘায়িত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। যদি সেটি হয় তাহলে প্রবীণদের দুর্ভোগের মাত্রা যে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত এবং তীব্র হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সর্বস্তরের প্রবীণের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কল্যাণ নিশ্চিতে বয়স্ক ভাতাকে সর্বজনীন করা এখন শুধু সময়ের দাবি নয়, এর কোনো বিকল্পও নেই।

সরকারের কাছে আমাদের আরও একটি আবেদন: বয়স্ক ভাতার আওতায় বর্তমানে একজন প্রবীণ মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। বাজারমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা মূল্য এবং চলমান দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে এই পরিমাণ টাকা একজন সহায়-সম্বলহীন প্রবীণের জীবন ধারণের জন্য কিছুই না। এই অপর্যাপ্ত ভাতাকে অর্থবহ করা যদিও সময়ের দাবি, দুর্যোগকালে ভাতার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমরা তাই আশা করব, সংকট চলাকালে অর্থাৎ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আবার স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বয়স্ক ভাতার পরিমাণ কমপক্ষে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হবে। পাশের দেশ নেপালও এই সংকটকালে সাময়িকভাবে বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বাড়িয়েছে।

সরকারের সহায়তায় প্রবীণদের জীবন শান্তিময়, স্বস্তিময়, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠবে, এটিই আমাদের চাওয়া।

ড. শরীফা বেগম: সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা ফেলো, বিআইডিএস। সহসভাপতি, ফোরাম ফর দ্য রাইটস অব এল্ডারলি, বাংলাদেশ (এফআরইবি)।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন