বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পাশ থেকে ছেলে সাজ্জাত জড়িয়ে ধরল মাকে। সদ্য বাবা হারানো সাজ্জাত মাকে কী সান্ত্বনা দেবে। দুজনেই কাঁদলেন। কোনোভাবে মনকে বোঝাতে পারছেন না মা-ছেলে। তিন দিনের জ্বরে চলে গেলেন সাজ্জাতের বাবা মহরম আলী (৪৮)। বুধবার সকাল নয়টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে মারা যান তিনি।

মহরমের বাড়ি চন্দনাইশের রৌশন হাট এলাকায়। সাজ্জাত একমাত্র সন্তান। এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী সে। মহরম স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। দুই কামরার একটা ঘর ছাড়া তাঁদের কিছু নেই। এখন ঘরের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি চলে গেলেন।

দুপুর সাড়ে ১২টায় চমেক করোনা ওয়ার্ডে কথা হয় তাঁদের সঙ্গে। লাশ তখনো ওয়ার্ডের ভেতরে। গত তিনটি রাত বলতে গেলে তাঁদের নির্ঘুম কেটেছে। যমে–মানুষে টানাটানি চলেছে কেবল। প্রিয়জনকে বাঁচাতে কত চেষ্টায় না করেছেন তাঁরা।

ফেরদৌসী আকতার বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে জ্বর হয়েছিল। এরপর ওষুধ খেয়ে ভালো হয়ে যায়। জ্বর কমে যায়। তিন দিন আগে আবার জ্বর ও কাশি হয়। পরে সোমবার পটিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপর মঙ্গলবার রাতে এখানে নিয়ে আসি। তখন তীব্র শ্বাসকষ্ট ছিল। সকালে চলে গেল।’ বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার আগে মহরম আলীর করোনা পরীক্ষা করানো হয়। তাতে পজিটিভ আসে। টিকা দেওয়া ছিল না মহরমের। জ্বর থেকে একটু ভালো হয়ে তিনি আবার বাজারে মাছও বিক্রি করেছেন। এরপর আবার জ্বরে পড়েন।

মহরম আলীকে নিয়ে মা-ছেলের যুদ্ধ চলেছে তিন দিন। দুজনই এখন ক্লান্ত খুব। একমাত্র ছেলে সাজ্জাত ছিল আদরের। যখন সকালে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, তখন সাজ্জাত মাকে বাবার পাশে বসিয়ে রেখে নার্স ডাকতে গিয়েছিল। আবার মায়ের ডাক পড়ায় সাজ্জাত ফিরে আসে শয্যা পাশে।

সাজ্জাত বলে, ‘বাবা মাকে বলছিল, “আঁর ফোয়ারের ডাকো। আঁই বাইছতাম নয়। (আমার ছেলেকে ডাকো, আমি বাঁচব না।)” পড়ে আমি এসে হাত ধরার সঙ্গে সঙ্গে মারা যান বাবা।’

তিন দিনে তাঁদের খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা। ধারদেনা করে চিকিৎসার জন্য শহরে নিয়ে আসেন। এখন কীভাবে লাশ বাড়ি নেবেন, তা নিয়ে চিন্তিত তাঁরা। পরে পরিচিত লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে গাউছিয়া কমিটির একটি অ্যাম্বুলেন্স আনা হয়। বেলা দুইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয় মহরম আলীর লাশ। পাশে বসেন সাজ্জাত ও ফেরদৌসী আকতার। বলতে থাকেন, ‘যখন এনেছিলাম, তখনো কথা বলছিল মানুষটি। এখন লাশ নিয়ে ফিরছি বাড়িতে। আমার সব শেষ। আল্লাহ নিয়ে গেল। আল্লাহই জানে আমরা মা-ছেলের ভবিষ্যৎ।’

এক দিনে হাজার শনাক্ত

চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার) করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে ১০ জন মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৩৫ শতাংশ।

মহামারি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক ব্যক্তির করোনা শনাক্ত হলো গত ২৪ ঘণ্টায়। শুধু তা-ই নয়, এই প্রথম চট্টগ্রামে এক দিনে করোনা শনাক্ত হাজার ছাড়াল। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৯৫৫ জনের করোনা শনাক্তের তথ্য জানানো হয়েছিল। মারা যান ১০ জন।

সরকারি হিসাব অনুসারে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজার ৭৮৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনায় চট্টগ্রামে মারা গেছেন মোট ৮০০ জন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৮৬৯ জনের করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নগরের ৬৫২ জন। নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার ৩৫১ জন। আর মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ জন শহরের, ৬ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন