জাতিসংঘের প্রস্তাব

বিশ্ব এমন সংকট কমই দেখেছে

বিজ্ঞাপন
default-image

বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বিশ্ব এখন সবচেয়ে বড় সংকটে। জাতিসংঘ বলছে, তাদের ৭৫ বছরের ইতিহাসে বিশ্বে এমন সংকট খুব কমই দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজ, অর্থনীতি, বাণিজ্য—সবই করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত। এই মহামারি প্রতিরোধ ও এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সংহতি ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গত শুক্রবার গৃহীত প্রস্তাবে কোভিড-১৯ সম্পর্কে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ১৬৯টি দেশ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। হাঙ্গেরি ও ইউক্রেন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আগামী মঙ্গলবার থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশন শুরু হবে। ওই অধিবেশনে এই প্রস্তাব পাস হওয়ার কথা রয়েছে।

সাধারণ পরিষদে গৃহীত ওই প্রস্তাবে বলা হয়, স্বাস্থ্যের ওপর করোনার প্রভাব এবং করোনার কারণে মানুষের মৃত্যু গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শরণার্থী বা বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে থাকা নাগরিক ছাড়াও সমাজের সব স্তরের মানুষ করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতির তালিকায় আছে জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও শিক্ষা। দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের ক্ষেত্রে যে অর্জন ছিল, তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে মহামারিতে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাতিসংঘের যাত্রা শুরু। মহাযুদ্ধ শেষে বিশ্ব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বের মানুষ শান্তি চেয়েছিল। শুরু থেকেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘ। গত ৭৫ বছরে বিশ্বে বহু দেশ যুদ্ধে জড়িয়েছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে জাতিসংঘের কাছে। বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর করা বহু বছরের পুরোনো চ্যালেঞ্জ। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্য একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ শরণার্থী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। ১৪টি অঙ্গ সংস্থা (ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ ইত্যাদি), ১৪টি বিশেষায়িত এজেন্সি (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি) এবং আরও ৫টি পৃথক সংস্থার মাধ্যমে জাতিসংঘ বিশ্বের ১৯৩টি দেশে কাজ করে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কৃষি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে করোনার ছাপ পড়েনি। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর সময় লাগবে। কিন্তু এখন আশা করা হচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থনীতি আগের জায়গায় ফিরে আসবে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ২৩টি মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যের কাজ করে। এতে কাজের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও যেন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পায়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীনে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর ৩০ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে। মহামারির প্রথম আঘাতটি আসে স্বাস্থ্য খাতে। করোনা সংক্রমণের চরিত্র বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের জানা ছিল না। এর চিকিৎসায় কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। রোগী ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করণীয় বুঝে ওঠার আগেই অনেক মানুষ মারা যেতে থাকেন। সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতিতে অক্সিজেন সরবরাহ, ভেন্টিলেটর নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিতর্ক দেখা দেয়। দেশে দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকে।

সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পন্থা হিসেবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। বন্ধ করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশ্বে প্রায় ১৩৭ কোটি শিক্ষার্থী করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় চার কোটি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দেশে দেশে নাগরিকদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কার্যকর করা হয় ‘লকডাউন’ (অবরুদ্ধ)। এতে বহু মানুষের জীবিকার উপায় বন্ধ হয়ে যায়। এসব কারণে অনেক দেশে দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। দারিদ্র্য বেড়েছে বাংলাদেশেও। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত মে মাসে এক প্রাক্কলনে বলেছিল, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বে অর্থনৈতিক ক্ষতি দাঁড়াতে পারে ৫ দশমিক ৮ থেকে ৮ দশমিক ৮ লাখ কোটি মার্কিন ডলার।

জাতিসংঘের প্রস্তাবে বলা হয়, এই মহামারির কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী ও বালিকারা। তাঁদের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁরা শিক্ষা ও অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আবদ্ধ থাকার কারণে অনেকেই পারিবারিক নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মহামারির শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, এই মহামারি সমগ্র বিশ্বের সমস্যা। সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবেও একই কথা বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জাতিসংঘের এই মূল্যায়নকে যথার্থ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত শতাব্দীর শুরুর দিকে স্প্যানিশ ফ্লু–জনিত মহামারির চেয়ে এই মহামারির সংক্রমণ-পরিধি বড়। পুরো পৃথিবীর মানুষ সংক্রমণে আক্রান্ত। এই মহামারির স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা মোকাবিলায় আর্থিক ক্ষতি অপূরণীয়। বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। এই মন্দা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এই চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সাইফুদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, মহামারি নিয়ন্ত্রণে আপাত সফল দেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ কর্তৃত্ববাদী। উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী হয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে বলা জাতিসংঘের পক্ষে সম্ভব নয়। এদিক থেকেও এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

এই মহামারির স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা মোকাবিলায় আর্থিক ক্ষতি অপূরণীয়। বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। এই মন্দা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অর্থনীতিবিদ
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন