default-image

হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পড়াশোনার জন্য আফ্রিকার দেশ মিসরে আসি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। পরিবারের বাকিরা আসে এক বছর পর। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদে অধ্যয়নরত। একে তো ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা ও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, তার ওপর এই বৈশ্বিক মহামারি যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা।

পড়াশোনা, ট্রেনিং ভালোই চলছিল। চলতি বছর এপ্রিলে এক পর্বের পরীক্ষাও নির্ধারিত ছিল, যা পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্ধ করা হলো। মজার একটি বিষয় হলো আমার বাসার চারপাশটা মেডিকেল সরঞ্জামের দোকানে ভরপুর। আর দেখতে থাকলাম, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক থেকে সবাই কেন যেন মাস্ক মজুত করছে। রহস্যটা টের পেলাম এক মাস পর। ততক্ষণে এ দেশে আস্তে আস্তে করোনার ছোঁয়া লাগতে শুরু করে এবং আস্তে আস্তে সবকিছু বন্ধ হতে শুরু করে।

একটু একটু করে কেমন যেন সব বদলাতে শুরু হয়। বাড়তে থাকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এর মধ্যে আমাদের দূতাবাস থেকেও সতর্কীকরণ বার্তা আসে ই–মেইলে এবং অল্প হলেও বুঝতে পারি এর ভয়াবহতা। ট্রেনিংয়ের জন্য হাসপাতালে যেতে হতো। সেখানেও নিয়মের বেশ পরিবর্তন এবং ইমার্জেন্সি ছাড়া সব ধরনের রোগী ভর্তি স্থগিত করা হয়।

মিসরের সবচেয়ে ভালো দিক হলো এরা শুরু থেকে হাসপাতালগুলোকে ভাগ করে ফেলল। দূতাবাসের মাধ্যমে তার একটি তালিকাও সবার মধ্যে পৌঁছে দিল। এর মধ্যে দূতাবাস থেকে ফোন করে প্রধান কাউন্সিলর বললেন, ‘আপনি সিনিয়র ডাক্তার। আপনাকেসহ আপনার মেডিকেলের আরও ডাক্তারদের নিয়ে একটি টেলিমেডিসিন গ্রুপ করতে চাই। এই দুর্যোগে আপনার মতামত কী?’ তখন আমি শুধু একবাক্যে বললাম, ‘আমি কিছুই চিন্তা করতে চাই না। কারণ, দেশের মানুষকে সেবা করার এই প্রয়াস এমন অবস্থাতে, আপনি লিস্ট করে আমাদের দূতাবাসের অনলাইন পেজে দিয়ে দিন।’ তখন ভাবিনি, আমাদের মানুষগুলো কত কষ্টে আছে এই অচেনা পরিবেশে। এরপর থেকেই প্রতিদিন ফোন আসতে থাকল। চেষ্টা করতে থাকলাম সাধ্যমতো, জানি না কতটুকু পেরেছি।

default-image

অনেক কষ্ট হয় যখন অবৈধ প্রবাসীর থেকে ফোন আসত। মানে যাদের ভিসায় সমস্যা আছে। তাদের জন্য ইচ্ছা করলেও অনেক কিছু করতে পারতাম না। শুধু ভাবতাম, এত কষ্ট করে চোরের মতো লুকিয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে একমুঠো ভাতের জন্য এই হাজারো মাইল দূরে কেন তারা পাড়ি জমিয়েছে। পরে জানতে পারলাম, আমাদের দেশেরই কিছু মানুষরূপী পশুর প্রলোভনে তারা আসে। অথচ আজ এখানে বিলাসী জীবন যাপন করছে ওই পশুগুলো। যাদের এই পশুগুলোকে শাস্তি দেওয়ার কথা, তারাও কিছু করছে না। পশুগুলো বহাল তবিয়তে চলাফেরা করে। আশা করি, এই মহামারিতে হয়তোবা তাদের চরিত্রের পরিবর্তন হবে। মাঝেমধ্যে ফোন আসত, ‘ডাক্তার সাহেব, আমাদের তো কাজ বন্ধ, আমরা চলব কী করে?’ এরপর দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবস্থা হলো স্বল্প পরিসরে আর্থিক সহায়তার। মিসর যদিও অনেক কঠোর। নিরাপত্তা এবং সতর্কতা পালনের পরও কেস এবং মৃত্যু বাংলাদেশের কাছাকাছি। আজও এখানে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়তে পারিনি। আর ঈদ যে কীভাবে গেল, তা আল্লাহ ভালো জানেন। সবাই সতর্ক এবং নিরাপদে থাকুন।

*রেসিডেন্ট নিউরোসার্জারি, কাসার আল আইনি মেডিকেল স্কুল, ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিসর। enamulhuq2003@icloud.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0