default-image

মার্চের শুরুতে দেশে হঠাৎ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে গেলে হাসপাতালে রোগীদের ঠাঁই পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুনরায় চালু করা হয় রাজধানীর মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কোভিড হাসপাতাল। কার্যক্রম শুরুর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। চিকিৎসা নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

এদিকে চলতি মাসের প্রথম থেকে দেশে চলমান বিধিনিষেধে সংক্রমণ কমায় এই হাসপাতালেও রোগী আসা কমেছে। তবে এখনো গুরুতর অসুস্থদের চিকিৎসাসেবার সুবিধাসংবলিত নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চাপ রয়েছে।

করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ১৮ এপ্রিল এক হাজার চার শয্যার এই হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয়। তবে রোগী ভর্তি শুরু হয় পরদিন থেকে। গত ৮ দিনে এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৭২৬ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৯৭ জনই আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালে আইসিইউয়ে আসন রয়েছে ১১২টি। এ ছাড়া হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ১০০টি শয্যা, কেবিন ২৫০টি, সাধারণ শয্যা রয়েছে ৪৮৮টি। এইচডিইউ ও কেবিনে কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার সুবিধা রয়েছে। সাধারণ শয্যাগুলোতেও সিলিন্ডার অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অসুস্থতা নিয়ে আসা রোগীদের প্রাথমিকভাবে সামাল দিতে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ৫০টি শয্যা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কিডনির সমস্যা নিয়ে আসা কোভিড রোগীদের ডায়ালাইসিস সুবিধাসহ চারটি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় সব ধরনের ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য ওষুধও বিনা মূল্যে হাসপাতালের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। তবে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা ক্যানসারের মতো জটিল অসুখ থাকা রোগীদের বিশেষ ওষুধ সরবরাহে হাসপাতালটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম কয়েক দিন দৈনিক দেড় শর বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসতেন। সেখানে গত দু-এক দিনে এই সংখ্যা ৫০ জনের নিচে নেমে এসেছে।

default-image

হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের নিবন্ধন বই ঘেঁটে জানা যায়, উদ্বোধনের পরদিন ১৯ এপ্রিল এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন ১৮৯ জন। গতকাল রোববার চিকিৎসা নিতে আসেন ৩২ জন। আর আজ সোমবার সকাল সাতটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত আসেন আটজন রোগী।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন আজ প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ কোভিড-১৯ রোগীই শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসছেন। তাঁদের অনেককে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরামর্শ ও ওষুধ দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা গুরুতর অসুস্থ, তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।

এখন রোগীর চাপ অনেকটাই কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগীর যে চাপ দেখা যাচ্ছিল, সেটি পরে আর হয়নি। অপর দিকে প্রতিদিনই হাসপাতালে জনবল বাড়ছে। এ কারণে চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ এই হাসপাতালে নতুন ৫৪ জন চিকিৎসক যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি নতুন করে ১০০ জন নার্স যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনকে আইসিইউতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এখন হাসপাতালে মোট চিকিৎসকসংখ্যা ১৭৫, আর নার্স আছেন ২৫০ জন।

রোগী ভর্তি শুরুর পর থেকে গত ৭ দিনে এই হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০ জন। গতকাল সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন আটজন।

আজ বেলা দুইটার দিকে ছেলে সজীব হোসেনের সঙ্গে হাসপাতাল ছাড়েন ৬০ বছর বয়সী ইয়াসমিন বেগম। তিনি এক সপ্তাহ ধরে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ আসার পর তাঁর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা (স্যাচুরেশন) কমে যায়। এরপর তাঁকে এখানে নিয়ে আসেন স্বজনেরা।

সজীব প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মায়ের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৮০–তে নেমে আসে। এখন অক্সিজেনের মাত্রা ৯৪। তবে তাঁর মায়ের করোনা পরীক্ষা করে নেগেটিভ সনদ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা বলেছেন, এখন বাড়িতে থেকেই আমার মা বাকিটা সুস্থ হয়ে যাবেন। এই হাসপাতালের চিকিৎসা ভালো। খরচও অনেক কম।’

এই কয়েক দিনে হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৪ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ এখানে চিকিৎসা নিতে আসা প্রতি ১৪ জনের ১ জন রোগী মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ২ জন।

করোনা চিকিৎসায় বিশেষায়িত এ হাসপাতালের কার্যক্রম বেসামরিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তবে হাসপাতালটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের যেকোনো অঞ্চলের করোনায় আক্রান্ত বা করোনার উপসর্গ রয়েছে এমন রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

গত বছর মার্চে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়। সংক্রমণ বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে এখানে করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতাল চালু করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। পরে সংক্রমণ কমে গেলে হাসপাতালটিও বন্ধ হয়ে যায়। গত মাসের শুরু থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। তখন হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভর্তি করাই কঠিন হয়ে পড়ছিল। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালটি আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন