default-image

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও শীতকালে সংক্রমণ বৃদ্ধির যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের জন্য কোয়ারেন্টিনের (সঙ্গনিরোধ) আয়োজন করতে সারা দেশের সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা জোরদার করার কাজও শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাস্ক ব্যবহারের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এর আগের দিন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বিদেশ থেকে আসা প্রত্যেক ব্যক্তির কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য সরকার ইতিমধ্যে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশও দিয়েছে। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’, অর্থাৎ মাস্ক না পরলে সেবা নেই—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সরকার করোনাবিরোধী প্রচারণা চালাতে যাচ্ছে।

বেশ কিছুদিন ধরে এটা ধারণা করা হচ্ছে যে শীতকালে দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি করোনার সংক্রমণ আরও প্রবল হতে পারে বা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা আছে।

বিশ্বের বেশ কিছু দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ দেখা দিয়েছে, এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়েছে ইউরোপে। সেখানে কোনো কোনো শহর বা অঞ্চলকে নতুন করে লকডাউন বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশের সব সিভিল সার্জনের অনলাইন সভা হয়েছে। ওই সভা থেকে কোয়ারেন্টিন, জনসচেতনতা, নমুনা পরীক্ষা বিষয়ে সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কোয়ারেন্টিন পরিস্থিতি কী

নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে ৩৯ হাজার ৩৫৪ জন কোয়ারেন্টিনে আছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর মধ্যে দুটি কেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছেন ১ হাজার ১৬১ জন। একটি আশকোনা হজ ক্যাম্পে ৩৯১ জন এবং দিয়াবাড়িতে ৭৭০ জন।

বাকিরা কোথায় কোয়ারেন্টিনে আছেন, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাকিরা হোম কোয়ারেন্টিনে। অর্থাৎ নিজ নিজ বাড়িতে আছেন।

সরকারি তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৩ হাজার ৯৭৩ ব্যক্তি বিদেশ থেকে এসেছেন। এর মধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে এসেছেন ৩ হাজার ৪৫৯ জন। ১২টি স্থলবন্দর দিয়ে এসেছেন ৪৭১ জন। আর দুটি সমুদ্রবন্দর দিয়ে এসেছেন ৪৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন বন্দরের কাছে বা বিভিন্ন জেলায় যেসব কোয়ারেন্টিন সেন্টার খোলা হয়েছিল, দুটি ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। সিভিল সার্জনদের নতুন করে কেন্দ্র খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৬২৯টি কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র একসময় চালু ছিল বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বেশ কিছু কেন্দ্র করা হয়েছিল স্কুল-মাদ্রাসা বা কমিউনিটি সেন্টারে। এখন স্কুল-কলেজ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। তাই আগের প্রতিষ্ঠানগুলো আর ব্যবহার করা যাবে না। নতুন প্রতিষ্ঠান খুঁজতে হবে।

যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু সাহীন প্রথম আলোকে বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিন করে রাখা হতো বেনাপোল পৌর কমিউনিটি সেন্টারে। চার আস আগে সেন্টারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই কমিউনিটি সেন্টার এখন আর ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। এখন নতুন জায়গা খুঁজতে হবে।

ভারত থেকে আকাশপথে নিয়মিত যাত্রী আসা শুরু হবে ৪ নভেম্বর থেকে। তখন বিমানবন্দর দিয়ে আসা যাত্রী বেড়ে যাবে। তাঁদের কোয়ারেন্টিন কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, প্রতিদিন ১ হাজার ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টিন করলে ১৪ দিনে সংখ্যা ১৪ হাজারে পৌঁছায়। প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। এত মানুষ রাখার মতো জায়গা বিমানবন্দরের কাছে নেই। আশকোনা হজ ক্যাম্প ও দিয়াবাড়িতে সর্বোচ্চ দুই হাজার ব্যক্তির থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব। এই পরিমাণ মানুষের খাওয়ার আয়োজন করাও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে কঠিন।

বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একাধিক জনস্বাস্থ্যবিদ। দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল ইউরোপ থেকে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে। শুরু থেকে এই ভাইরাসের বহু রূপান্তর হয়েছে। তাই বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের মধ্যমে করোনাভাইরাসের নতুন ক্লেডের (ধরন বা সাবগ্রুপ) মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর তাঁরা বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

মাস্ক নিয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে জেলা পর্যায়ে আইসিইউ শয্যা বাড়ানো বা হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ

মাস্ক নিয়ে প্রচারণা

মাস্ক পরার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ব্যানার টাঙানোর উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা ও সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে এই ব্যানার টাঙানো হবে। গতকালের সভা থেকে দেশের সব সিভিল সার্জনকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

গতকাল বিকেলে যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু সাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যশোরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেছি। মাস্ক নিয়ে প্রচারণার কাজে ব্যবসায়ীরাও যুক্ত হবেন। এ ছাড়া সরকারি অন্যান্য দপ্তরও একই কাজ করবে।’ আরও একাধিক জেলার সিভিল সার্জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একই ধরনের নির্দেশনার কথা জানা গেছে।

মাস্কের ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, সচেতনতা বাড়াতে নাগরিক সংগঠন ও দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাস্কের প্রচারণায় সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। সবাইকে নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।

তবে আরও কিছু বিষয়ে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, জেলা পর্যায়ে সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মাস্ক নিয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে জেলা পর্যায়ে আইসিইউ শয্যা বাড়ানো বা হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0