default-image

করোনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে পালাক্রমে অর্ধেক জনবল বা মাসিক নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অর্ধেক করে ফ্লাইট পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাইলটরা। তাঁরা বলছেন, করোনাকালে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে তাঁরা স্বীকৃতি ও মর্যাদা পাননি। কিন্তু দায়িত্ব পালন করছেন সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবেই। উপরন্তু কাটা হয়েছে বেতন-ভাতা, আবার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা।

এই অবস্থায় ক্ষুব্ধ পাইলটরা নির্ধারিত কর্মঘন্টার বেশি দায়িত্ব পালন করতে চাচ্ছেন না। তাঁদের মাসে নির্ধারিত কর্মঘন্টা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ৬০ ঘণ্টা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ৭৫ ঘন্টা। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) পক্ষ থেকেও ১৬ এপ্রিল বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে তাঁদের হতাশা ও দাবির কথা জানানো হয়েছে।

পাইলটরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের কারণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রথমে অর্ধেক কর্মী দ্বারা অফিস পরিচালনা করতে সরকারি নির্দেশনা আছে। তেমনি তাঁদের ক্ষেত্রেও পালা করে দায়িত্ব পালন বা মাসিক নির্ধারিত কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা হোক। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ও পরিবারের চিকিৎসা ভাতার ব্যবস্থা করা হোক।

বিজ্ঞাপন

করোনা পরিস্থিতিতে গত বছরের ৫ মে এক প্রশাসনিক আদেশে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পাইলটদের বেতন কমানো হয়। এর মধ্যে পাইলটদের বেতন কমে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। বন্ধ হয়েছে ওভারসিস অ্যালাউন্স, যা স্থায়ী বেতনের অংশ। ফলে মোট বেতন কমার হার দাঁড়িয়েছিল ৫৭ থেকে ৬৫ শতাংশ। অবশ্য গত মাসের প্রথম সপ্তাহে বিমান বেতনের কর্তনের হার ১০ শতাংশ কমিয়ে আনে। এ ছাড়া বন্ধ হয়েছে ওভারটাইম, প্রোডাক্টিভিটি অ্যালাউন্স ও ফ্লাইং অ্যালাউন্স। যদিও গত ১৮ মার্চ বিমান কর্তৃপক্ষ এক চিঠিতে জানিয়েছে, বিমানকর্মীদের কাজ অত্যাবশকীয় জরুরি।

করোনাকালে আমরা অনেক মানসিক চাপ ও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। চিকিৎসার খরচ তো দূরের কথা, উল্টো বেতন কমানো হয়েছে
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পাইলট

বাপা বলছে, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা কমেনি। অথচ শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সব কর্মীর বেতন কর্তন করা হয়েছে। এতে পাইলটদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

বাপার সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাইলটরা বেতন নিয়ে এসব অনিয়ম মানতে নারাজ। জাতীয় প্রয়োজনে পাইলটরা বিমান চালাতে প্রস্তুত। তবে করোনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে পালাক্রমে অর্ধেক জনবল বা মাসিক কর্মঘণ্টা অর্ধেক করে ফ্লাইট চালানো হোক। একই সঙ্গে বেতন–ভাতার বিষয়টিও সুরাহা করা দরকার।’

করোনাকালে কখনো কখনো ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়েছে বিমানের পাইলটদের। এমন একজন পাইলট নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনাকালে আমরা অনেক মানসিক চাপ ও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। চিকিৎসার খরচ তো দূরের কথা, উল্টো বেতন কমানো হয়েছে।’

পাইলটরা বেতন নিয়ে এসব অনিয়ম মানতে নারাজ। জাতীয় প্রয়োজনে পাইলটরা বিমান চালাতে প্রস্তুত। তবে করোনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে পালাক্রমে অর্ধেক জনবল বা মাসিক কর্মঘণ্টা অর্ধেক করে ফ্লাইট চালানো হোক। একই সঙ্গে বেতন–ভাতার বিষয়টিও সুরাহা করা দরকার
বাপার সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান

বাপা জানিয়েছে, বিমানে পাইলট আছেন ১৫২ জন। এর মধ্যে বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছয়জন। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। পাইলটরা বলছেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলেও তাঁরা কোনো চিকিৎসা ভাতা পাননি। গত জানুয়ারিতে লন্ডন থেকে একটি ফ্লাইট নিয়ে দেশে আসার পর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজন পাইলট প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমিসহ পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়েছিলাম। হাসপাতালে ভর্তি হয়েও কোনো মেডিকেল অ্যালাউন্স পাইনি। অথচ আমার বেতন কমেছে ৫৭ শতাংশ।’

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী প্রথম আলোকে গত শুক্রবার বলেন, ‘পাইলটদের কর্মঘণ্টা, জনবল এসব বিষয়ে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয়। পর্ষদে সচিব, এনবিআরের চেয়ারম্যান, বেবিচক, পররাষ্ট্রসচিব রয়েছেন। তাঁরা সবকিছু দেখছেন।’ পাইলটদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংকটময় বিশেষ মুহূর্ত তো সামাল দিতে হবে। পাইলটরা যে ত্যাগ স্বীকার করছেন, কর্তৃপক্ষ তা দেখছে। সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

এর আগে গত ১ মার্চ প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মাসখানেকের মধ্যে বেতন কর্তনবিষয়ক সমস্যার সমাধান হবে। এর অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ধারণা ছিল পরিস্থিতি ভালো হবে। কিন্তু সংকট বড় আকারে ফিরে এল।

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন