default-image

স্বেচ্ছাসেবী হওয়ার ইচ্ছা আগে কখনো আমিনা রহমানের মনে জাগেনি, তা নয়। তবে নানা হিসাব-নিকাশের প্যাঁচে শেষ পর্যন্ত সাহসে কুলোয়নি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর। কিন্তু যে করোনাভাইরাস সবার মনের কোণে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেই অদৃশ্য শত্রুই সাহসী করে তুলেছে আমিনাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আজ সোমবার বেলা দেড়টার দিকে করোনার টিকাপ্রত্যাশীদের ভিড় কমে এসেছিল। তখনই কথা বলার ফুরসত মিলল জীবনে প্রথম স্বেচ্ছাসেবীর কাজে নামা আমিনা রহমানের সঙ্গে। কেন, কীভাবে স্বেচ্ছাসেবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? তা-ও এই করোনাসেবা-সংশ্লিষ্ট কাজে? দু-একটি প্রশ্ন করতেই কথার ডালি মেলে ধরলেন, ‘টিকাদান কার্যক্রমে আমি স্বেচ্ছাসেবী হতে চাই, শুনেই মা–বাবার আপত্তি। বহু কষ্টে তাঁদের বোঝাতে পেরেছিলাম।

বলেছিলাম, কেউ না কেউ কাজটা তো করবেই। তাহলে আমি কেন নয়? শেষ পর্যন্ত অনুমতি পেয়ে কাজটা শুরু করলাম। এরপর কয়েক দিনেই সবকিছু বদলে গেল।’

অনুমতি দিলেও শুরুতে দ্বিধান্বিত ছিলেন আমিনার বাবা-মা। এর মধ্যে একদিন তাঁকে টেলিভিশনের খবরে দেখলেন। তাঁদের মনে হলো, বেশ তো! মেয়েটা ভালো একটা কাজই তো করছে। তবে সবচেয়ে বেশি কাজ হলো সেদিন, যেদিন আমিনার মা নিজেই হলেন টিকাপ্রত্যাশী। টিকা নিতে এলেন বিএসএমএমইউতে, যেখানে তাঁর মেয়ে স্বেচ্ছাসেবী। মায়ের কাছে মেয়ের কাজের প্রশংসা করলেন তাঁর সহকর্মী ও হাসপাতালের কর্মীরা। এতে মায়ের মন পুরোটাই গলে গেল। সেদিন আমিনা বাসায় ফিরে তাঁর কাজের কদরটা বুঝতে পারলেন।

বিজ্ঞাপন

আমিনা বলেন, ‘পরে মা-ই আমাকে সাহস জুগিয়ে চলেছেন। আর টিকা নেওয়া মানুষগুলোর মুখে হাসি দেখে সাহস আরও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে দেশের সেবা করতে পারছি, তা–ও খারাপ এই সময়টাতে। এ জন্য নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।’

তাঁরাই আগে যান, আসেন সবার পরে
বিএসএমএমইউতে টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত আছেন আমিনার মতো ৯ জন নারীসহ মোট ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী। সবাই কাজ করছেন রেড ক্রিসেন্টের হয়ে। তাঁরা কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ১৩-১৪ জন প্রথমবারের মতো স্বেচ্ছাসেবী হয়েছেন। বাকিদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

দাপ্তরিক ঘোষণা মোতাবেক, টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয় সকাল আটটায়। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে টিকাদান শুরু করতে নয়টার মতো বেজে যায়। তবে স্বেচ্ছাসেবীদের আটটায়ই আসতে হয়, যেতে হয় সবার পরে। টিকাদান চলছে বিএসএমএমইউর কনফারেন্স সেন্টারে। ভবনের প্রধান ফটকে সব সময় থাকেন এক-দুজন স্বেচ্ছাসেবী।

default-image

তাঁদের কাজ টিকা নিতে আসা মানুষকে তথ্যকেন্দ্রে পাঠানো। সেখানে হাসপাতালের একজন নিজস্ব কর্মীর সঙ্গে দায়িত্বে আছেন রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা। তাঁরা টিকা কার্ড ও টিকাপ্রত্যাশীর মুঠোফোনে যাওয়া খুদে বার্তা যাচাই করছেন। এরপর টিকিট দিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আটটি রেজিস্ট্রেশন পয়েন্টের একটিতে।

প্রতিটি রেজিস্ট্রেশন পয়েন্টের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। নির্ধারিত স্থানে বসিয়ে টিকা কার্ডে স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন তথ্য পূরণে সহায়তা করা তাঁদের প্রথম কাজ।

এরপর কার্ডটি নিয়ে যাচ্ছেন রেজিস্ট্রেশন পয়েন্টে। সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে টিকাপ্রত্যাশীকে পাঠাচ্ছেন পাশের ভ্যাকসিন পয়েন্টে। টিকা নেওয়া শেষ হলে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছেন বিশ্রামাগারে। সেখানেও প্রস্তুত স্বেচ্ছাসেবীরা। টিকাগ্রহীতা কারও কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তার ওপরে নজর রাখছেন তাঁরা।

এই স্বেচ্ছাসেবীদের দলনেতা নাফিজ কালাম। তিনি বলেন, ভবনের প্রধান ফটকে টিকাপ্রত্যাশীকে তথ্য প্রদান থেকে শুরু করে টিকাদান-পরবর্তী হাসপাতালে অবস্থান পর্যন্ত পুরো সময়টাতে টিকাপ্রত্যাশীর পাশে থাকছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। টিকাদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় বেলা দুইটায়। অন্যরা এরপর চলে গেলেও স্বেচ্ছাসেবীরা তিনটার আগে কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন না।

default-image

ছয় ঘণ্টার প্রশিক্ষণে প্রস্তুত ৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবী
দলনেতা নাফিজ কালামের মতো আফিয়া উলফাসহ কয়েকজন পুরোনো স্বেচ্ছাসেবী। তবে আমিনা রহমানের মতো সাইফ হাসান, শারিফ খানসহ বেশির ভাগেরই পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাঁরা ছয় ঘণ্টার এক প্রশিক্ষণে নিজেদের প্রস্তুত করেছেন। দুজন চিকিৎসক গত জানুয়ারিতে রেড ক্রিসেন্ট কার্যালয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। পরদিনই তাঁদের স্বেচ্ছাসেবীর নিবন্ধন নিতে হয়েছে। এরপর একজন করে দলনেতার অধীনে বিভিন্ন টিকাদানকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজধানীর টিকাদানকেন্দ্রগুলোতে আছেন এমন ৪৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী। সারা দেশে সংখ্যাটা ৪ হাজারের বেশি।

এসব তথ্য জানালেন সায়মা ফেরদৌসী। তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিচালকের (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) দায়িত্বে আছেন। সায়মা ফেরদৌসী বললেন, রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা সারা বছরই প্রশিক্ষণ পান। সে হিসেবে তাঁরা সেবার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। তবে করোনার টিকাদান কার্যক্রমের বিষয়টি নতুন অভিজ্ঞতা। তাই স্বেচ্ছাসেবীদের স্বল্প পরিসরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সরকারি দিকনির্দেশনা মেনে সেবা দিতে তাঁদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
default-image

বিএসএমএমইউতে সপ্তাহে ছয় দিন টিকাদান চলে। দিনে সাত ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করেন স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রাপ্তি বলতে দুবার নাশতা। অবশ্য সব হাসপাতালে নাশতার ব্যবস্থাও নেই। দুপুরের খাবারটা নিজ নিজ বাসায় ফিরে সারতে হয়। তবু দেশের সেবায় তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যত দিন প্রয়োজন, তত দিন এই দায়িত্ব পালন করে যেতে চান স্বেচ্ছাসেবীরা।

স্বেচ্ছাসেবী আফিয়া উলফা বলেন, ‘দেশের সেবা কেনা করতে চায়? করোনাভাইরাস আমাদের সামনে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। কাউকে ডাকতে হয়নি। আমরা এসেছি ভেতরের তাগিদ থেকে। সেবার বিনিময়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারছি। এটা বড় এক প্রাপ্তি।’

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন