বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় টাকা খরচ করতে দক্ষ নয়। কিন্তু জরুরি কিছু কাজ তারা করবে না, এটা ভাবা যায় না। মহামারির সময় আন্তর্জাতিক হেলথ রেগুলেশন বাস্তবায়নে তারা মনোযোগী হলে সীমান্তে সংক্রমণ হয়তো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।
বে-নজির আহমেদ, জনস্বাস্থ্যবিদ

সাতটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়নি

করোনা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘কোভিড–১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত বছর প্রকল্পের পরিচালক বদলি করা হয়। তবে পরিচালক বদলালেও প্রকল্পে গতি আসেনি।

এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিব বিমানবন্দরে তিনটি, চট্টগ্রামে শাহ আমানত আন্দর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি এবং সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি মেডিকেল স্ক্রিনিং সেন্টার করার কথা বলা আছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরে একটি করে সেন্টার করার কথা।

কোন সেন্টারের আয়তন কী হবে, তা–ও প্রকল্প দলিলে উল্লেখ আছে। পাশাপাশি প্রতিটি সেন্টারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন থার্মাল স্ক্যানারসহ কী কী যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হবে এবং তার জন্য বরাদ্দ কত, তা বলা আছে।

প্রকল্পের পরিচালক ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, সাতটি সেন্টারের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বরাদ্দ আছে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এখনো শুরু হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, অবকাঠামো নির্মাণের পর প্রতিটি সেন্টারে চিকিৎসকসহ জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজীয় যন্ত্রপাতি কেনা হবে। কত দিনে সেটা হবে, তা তাঁরা জানেন না।

স্থলবন্দর তৈরি নয়

করোনা মোকাবিলায় এডিবির সহায়তায় কোভিড–১৯ রেসপন্স ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ প্রকল্পে ২৬টি স্থলবন্দরে মেডিকেল স্ক্রিনিং সেন্টার করার কথা। তবে প্রকল্প অনুযায়ী কাজ শুরু হয়নি।

এ প্রকল্পের পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখারও পরিচালক। গতকাল তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সাতটি স্থলবন্দরে স্ক্রিনিং সেন্টার হবে। শিগগির কাজ শুরু হবে।

প্রথম আলোর পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, ২০২১ সালের মার্চ মাসে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের একটি কক্ষে একটি আর্চওয়ে মেশিন বসানো হয়। এখানে যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন মো. ফজলুর রহমান জানান, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের জন্য পৃথকভাবে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো জনবল না থাকায় উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এসব কাজ চালানো হতো। এখন সীমান্ত বন্ধ রয়েছে।

তবে এখন ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকে প্রবেশ করা পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের কোনো প্রকার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে না। জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির নির্দেশনা রয়েছে, প্রয়োজন ছাড়া গাড়ির চালক নামতে পারবেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসা মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে তিন সদস্যের একটি মেডিকেল টিম ভারত থেকে আসা মানুষকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (তাপমাত্রা ও করোনা উপসর্গ) করেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে স্ক্যানার চালু করা হয়েছে।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হিলি বন্দরে ২০২০ সালের আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। এখন একটি অস্থায়ী বুথ করা হয়েছে। একই তথ্য পাওয়া গেছে বুড়িমারী, তামাবিল, বিবিরবাজার, আখাউড়া ও ভোমরা স্থলবন্দর থেকে। এসব বন্দরে মহামারি শুরুর পর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আগেও কাজ হয়নি

মহামারি শুরুর আগে ২০১৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার অবকাঠামো নির্মাণ ও সেবাদানের জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা। ছয় বছরমেয়াদি (২০১৭–২০২২ সাল) এ কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক হেলথ রেগুলেশন বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি শুরুর আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে এ নিয়ে কাজ বিশেষ হয়নি। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ খরচ হয়েছে প্রশিক্ষণে।

২০১৭ থেকে ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ওই কর্মসূচির পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা। তিনি অবসরে গেছেন। গত বছর মার্চে প্রথম আলোকে ব্যয়ের একটি লিখিত হিসাবে তিনি বলেছিলেন, ২০১৭–২০১৯ মেয়াদে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য রেগুলেশন বাস্তবায়ন কর্মসূচিতে প্রকৃত বরাদ্দ ছিল ২১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার। বরাদ্দের ৫৮ শতাংশ খরচ হয়েছিল প্রশিক্ষণ ও অবহিতকরণ সভায়। সীমান্তের বন্দরগুলোতে বা অন্য কোনো বন্দরে কী খরচ হয়েছিল তা হিসাবে ছিল না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক তিনটি বিমানবন্দর, দুটি সমুদ্র ও দুটি রেলওয়ে স্টেশন এবং ২৩টি স্থলবন্দর দিয়ে আসা ২২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৬ জন যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফরম তৈরি করা হয়েছে। ১৯টি নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি মানসম্মত কার্যপ্রণালি বিধি (এসওপি) তৈরি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে গমনাগমনের কারণে সংক্রমণ যেন না ছড়ায়, সে জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদস্যদেশগুলোর জন্য ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক হেলথ রেগুলেশন তৈরি করে। এতে আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা কী হবে, তা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘আমরা জানি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় টাকা খরচ করতে দক্ষ নয়। কিন্তু জরুরি কিছু কাজ তারা করবে না, এটা ভাবা যায় না। মহামারির সময় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য রেগুলেশন বাস্তবায়নে তারা মনোযোগী হলে সীমান্তে সংক্রমণ হয়তো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।’

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন