default-image

জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশে করোনার কারণে মাতৃ, শিশু ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা ৫০ শতাংশ কমে গেছে। কৈশোর স্বাস্থ্যসেবা কমেছে ৭০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে স্বাস্থ্য খাতের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে করোনার প্রথম ‘ঢেউ বা ধাক্কা’ এখনো শেষ হয়নি। এরই মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। সামনে শীতকাল। শীতে করোনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা গত রোববারই বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবারও মন্ত্রিসভার ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে একই আশঙ্কার কথা জানিয়ে এখন থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে কোভিড–১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি দ্বিতীয় দফার করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কমিটির ১৮ সেপ্টেম্বরের সভায় বলা হয়, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ উন্মুক্ত হচ্ছে ও হতে থাকবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশেও পুনরায় সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করা হয়নি। মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিষয়ে জোর দিতে হবে। তা না হলে স্বাস্থ্য খাতে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

জাতিসংঘের বাংলাদেশের জন্য তৈরি করোনার কারণে সৃষ্ট আর্থসামাজিক পরিস্থিতি মোকাবিলা বিষয়ে ‘ইমিডিয়েট সোশিও–ইকোনমিক রেসপন্স টু কোভিড–১৯’ পরিকল্পনা দলিলে করোনার কারণে স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ১১৮ পৃষ্ঠার দলিলের ভূমিকাতে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো বলেছেন, সীমিত খোলা অর্থনীতির বাংলাদেশ মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত। এর সঙ্গে রপ্তানি আদেশ বাতিল, প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার মতো দেশের সীমানার বাইরের ঘটনা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করা হয়নি। মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিষয়ে জোর দিতে হবে। তা না হলে স্বাস্থ্য খাতে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
আবু জামিল ফয়সাল, জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য
বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যে সংকট

জাতিসংঘ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির ক্ষেত্রে নিয়মিত ধারাবাহিক উন্নতি করেছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার সূচকের উন্নতি ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশ হয়েছে। প্রসবপূর্ব সেবার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।

যদিও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সীদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এদের ৬০ শতাংশের মৃত্যু হয় বয়স ২৮ দিন হওয়ার আগেই। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার আগেই শিশুমৃত্যুর একটি প্রধান কারণ ছিল নিউমোনিয়া।

অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হয়েছে করোনার কারণে। আকস্মিকভাবে সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোভিড–১৯ চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত কাজ থেকে সরিয়ে মহামারি নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত করা হয় এবং তাঁরা অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সংক্রমণের ভয় ছড়িয়ে পড়ার কারণে সেবা গ্রহণকারীরা সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসামগ্রী ব্যবহার নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মাসওয়ারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের হিসাব দেওয়া হয়েছে। জানুয়ারিতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছিল ৪১ হাজার ২৭১টি, মে মাসে তা কমে হয় ১৭ হাজার ২৩৭। একইভাবে অস্ত্রোপচারে প্রসসসংখ্যাও কমতে দেখা গেছে।

জাতিসংঘ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির ক্ষেত্রে নিয়মিত ধারাবাহিক উন্নতি করেছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার সূচকের উন্নতি ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশ হয়েছে। প্রসবপূর্ব সেবার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন

জানুয়ারি মাসে কাশি ও নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে সেবা নিতে এসেছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৫৬৭ জন, মে মাসে একই সমস্যা নিয়ে এসেছিল মাত্র ৫২ হাজার ৪৭৬ জন। পরিবার পরিকল্পনা সেবাও বাধাগ্রস্ত হয়। মাঠকর্মীদের জন্মবিরতিকরণ পিল ও কনডম বিতরণ কমে যায়। এই সময়ে নবজাতক সেবা কমে গেছে ৩১ শতাংশ। প্রসবপূর্ব সেবা কমে গেছে ৩৩ শতাংশ। মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে এইচআইভি সেবা। জাতিসংঘ বলছে, এইচআইভি পরীক্ষা কমেছে ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি।

জাতিসংঘ বলছে, মহামারির পাশাপাশি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা, অর্থনৈতিক চাপ ও নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে নানা ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। সেবার চাহিদা ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে পার্থক্য অনেক বেড়েছে।

গতকাল সোমবার সুন্দরবন–সংলগ্ন একটি উপজেলার একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মহামারির শুরুর দিকে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালে মানুষ কম এসেছে, সংক্রমণের ঝুঁকির আশঙ্কায় চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার কমতি ছিল। মে–জুন পর্যন্ত এ অবস্থা ছিল। তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সরকার কী করছে

গতকাল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং শীতকালে সংক্রমণ নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কাল (মঙ্গলবার) আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে করণীয় নির্ধারণসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হবে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকার তিন হাজার নার্স ও দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া তিন হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় মোট ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়া টিকা উৎপাদন করবে, এমন দেশের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহের জন্য একাধিক দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করেছে সরকার।

সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা বৃদ্ধি, হাসপাতাল সেবার পরিধি ও মান বৃদ্ধির কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোভিড–১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে পরামর্শ দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা বৃদ্ধি, হাসপাতাল সেবার পরিধি ও মান বৃদ্ধির কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোভিড–১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে পরামর্শ দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক
বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘ করোনাকালে ও করোনা–পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে ১২টি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে। এর মধ্যে আছে অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেবা দেওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজন জানা, স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থা দৃঢ় করা, স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা, সংক্রমণ প্রতিরোধব্যবস্থা দৃঢ় করা, মানসম্পন্ন ওষুধসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহে জোরাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নির্দিষ্ট সময়ের পরিস্থিতি জানতে ও পূর্বাভাস দিতে ডেটা ইন্টেলিজেন্স–ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রমাণভিত্তিক নীতি তৈরিতে ডেটা ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে নজরদারি বাড়ানো, স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, সমন্বিত বর্জ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রমাণভিত্তিক পুষ্টিনীতি তৈরি করা।

কোভিড–১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘জুন মাস থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় মাতৃ, শিশু ও পুষ্টিসেবা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে ঝুঁকি আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে কর্মপরিকল্পনায় ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সংক্রমণ প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। মানুষকে সচেতন রাখার ব্যাপারে প্রচার অব্যাহত রাখতে হবে।’

মন্তব্য পড়ুন 0