বাংলাদেশি ১৬ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে ১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০১ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৭৭.৮৩ টাকা ধরে) পাচারের ঘটনা তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রথম ধাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এ বিষয়ে স্থানীয় এইচএসবিসির কাছে কোনো তথ্য আছে কি না, তা জানতে চাইবে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকেই বিএফআইইউ এ কার্যক্রম শুরু করে বলে জানা যায়। এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এফআইইউর পাচার করা অর্থের তদন্ত কার্যক্রম।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক হংকং-সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সহায়তায় কর ফাঁকি দিয়ে বিশ্বব্যাপী ১১ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হওয়ার তথ্য গত দুই দিনে বিশ্বব্যাপী প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বাংলাদেশিদের অর্থ পাচারের তথ্যটিও রয়েছে। এর মধ্যে একটি হিসাবেই পাচার করা অর্থের পরিমাণ ৪৪ লাখ মার্কিন ডলার বা ৩৪ কোটি টাকা। ১৯৮৫ থেকে ২০০৭ সাল সময়ের মধ্যে এই পাচারের ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে। অবশ্য কারা এই অর্থ পাচার করেছে, সে তথ্য জানা যায়নি।
সংবাদমাধ্যমগুলো গতকাল বলছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থ কেলেঙ্কারি বা পাচারের এ ঘটনা প্রকাশের পর বিভিন্ন দেশের সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কর বিভাগ এরই মধ্যে জোরদার তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশিদের পাচার হওয়া অর্থ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএফআইইউ কী করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যেই তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিএফআইইউকে নির্দেশনা দিয়েছেন ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রাজী হাসান বলেন, স্থানীয় এইচএসবিসির কাছ থেকে কোনো তথ্য-উপাত্ত পেলে দেশে বিদ্যমান বৈদেশিক বিনিময় নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের লঙ্ঘন সেখানে হয়েছে কি না, তা দেখা হবে। পরে তথ্য-উপাত্ত পেতে সুইজারল্যান্ডের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট—এফআইইউর কাছে চিঠি পাঠানো হবে।
তবে গতকাল পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিষয়টি নিয়ে কেবল শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে।
এনবিআরের একজন শীর্ষ কর কর্মকর্তা জানান, সন্দেহভাজন কর ফাঁকিবাজদের ধরতে কোনো ব্যাংকের কাছে এর গ্রাহকের যেকোনো তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা আয়কর অধ্যাদেশের ১১৩ ধারায় দেওয়া আছে। কর ফাঁকি ধরতে বাংলাদেশের এইচএসবিসি ব্যাংকের গ্রাহক এমন করদাতার তথ্য চাইতে পারে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। পরে ওই করদাতার লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে বার্ষিক আয়কর বিবরণীর তথ্য মিলিয়ে কর ফাঁকির বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব।
২০৩টি দেশের ২ লাখ ৬ হাজার ব্যাংক হিসাবের তথ্য বিশ্লেষণ করে গত সোমবার দেশভিত্তিক একটি তালিকা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক কসসোর্টিয়াম (আইসিআইজে)। বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ হিসাব করে এ তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৮।
এইচএসবিসির সাবেক কর্মকর্তা হার্ভি ফ্যালসিয়ানি ২০০৮ সালে ফ্রান্স সরকারের কাছে প্রথম তথ্যগুলো ফাঁস করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির কর কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৯৯ দশমিক ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই কর ফাঁকি দিয়ে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটেছে।
এর আগে ২০১২ সালে মেক্সিকোর মাদক ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৯০ কোটি ডলার জরিমানা করে ব্যাংকটিকে।
বাংলাদেশিদের পাচার হওয়া অর্থের বিষয়ে ঢাকায় এইচএসবিসির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা তালুকদার নোমান আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সুইজারল্যান্ডের এইচএসবিসি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফ্রাঙ্কো মোরার দেওয়া একটি ই-মেইল বার্তা পাঠান এ প্রতিবেদককে। বার্তাতে বলা হয়েছে, এইচএসবিসি ব্যাংকের সুইজারল্যান্ড শাখা গ্রাহকদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে ২০০৮ সাল থেকেই ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। নতুন ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় যেসব গ্রাহক নতুন নীতিমালার শর্ত পূরণ করতে পারছে না, তাদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে ও নতুনদের আবেদনও গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফ্রাঙ্কো মোরা বার্তায় আরও বলেন, ‘আমাদের শর্ত পূরণ করে না এমন কোনো গ্রাহক বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এইচএসবিসির মাধ্যমে ব্যাংকিং করতে পারবেন না, ব্যবসায়িক লাভের চেয়ে এটা আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ সুইজারল্যান্ডের প্রচলিত প্রাইভেট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এইচএসবিসির সুইজারল্যান্ড সিইও।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন