default-image

জামালপুরে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির শ্রমিকদের তালিকায় আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ও আত্মীয়স্বজনের নাম রয়েছে। তবে তাঁরা কেউ কাজ করেন না। সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটেছে। অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন হাজিরা বাবদ ২০০ টাকা করে ৪০ দিনে ৮ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা।

তালিকা দেখে জানা গেছে, শ্রমিকের তালিকায় ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. জালাল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মো. সামছুল হক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দুদু মিয়া, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মো. আবদুল খালেক ও আয়নাল হক, ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য খোরশেদ আলম, বাদশা মিয়া ও আক্কাস আলীর নাম রয়েছে। নেতাদের আত্মীয়স্বজনের নামও রয়েছে।

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দিগপাইত ইউনিয়নে ৯টি প্রকল্পের অনুকূলে ৩৯৮ জন শ্রমিক মাটি কাটার কাজ করবেন। তাঁদের প্রত্যেককে ৪০ দিনে ৮ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। সেই হিসাবে ৩১ লাখ ৮৪ হাজার টাকার কাজ। ১৭ অক্টোবর থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, হরিদ্রাটা মোস্তফার বাড়ি হয়ে গান্দাইল মোড় পর্যন্ত একটি কাঁচা রাস্তার কাজ করছেন ৪০ জন শ্রমিক। অথচ এ কাজে ৯৪ জন থাকার কথা। রাস্তায় শুধুমাত্র ছোট-বড় গর্ত ভরাট করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বদরুন্নাহারের স্বামী মো. সুরুজ্জামান বলেন, ৪৮ জন নিয়মিত কাজ করেন। এরাই প্রকৃত শ্রমিক। বাকিদের মধ্যে বেশির ভাগ ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা। তাঁরা কাজ করতে আসেন না।

দিগপাইত বংশাই ব্রিজ থেকে বেইজাবাড়ি মোড় পর্যন্ত সড়কে শ্রমিক পাওয়া যায়নি। অথচ এ রাস্তায় ৪৩ জন শ্রমিক কাজ করার কথা সপ্তাহে টানা পাঁচ দিন। স্থানীয় ইজিবাইকচালক আল আমিন বলেন, এই রাস্তা দিয়ে ঠিকমতো চলাচল করা যায় না। কয়েক দিন আগে মাটি কেটেছে মাত্র। সেটাও খুব সামান্য। রাস্তায় এখনো বড় বড় গর্ত রয়েছে।

শ্রমিকেরা বলেন, গত ২০ দিন ধরে সব পরিশ্রম তাঁরা করছেন। কিন্তু সময়মতো টাকা পান না। আর নেতারা কাজ না করেও টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।

মাতারপাড়া খাবলীবাড়ি মোড় থেকে চাঁদপুর কাঠের ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার করার কথা রয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের ২০ দিন অতিবাহিত হলেও কোনো কাজ করা হয়নি। খোপীবাড়ি খন্দকার মোড় থেকে মেঘা মসজিদ পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা সংস্কারের জন্য ৩২ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা রয়েছে। সেখানে মাত্র ১৭ জন শ্রমিক পাওয়া যায়।

৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘শ্রমিকের তালিকায় নাম রয়েছে। তবে কাজ করি না। কাজের তদারকি করি। প্রতিটি প্রকল্পে শ্রমিকের তালিকায় নেতাদের নাম রয়েছে। তবে টাকা নেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, প্রত্যেক প্রকল্পে ১৫ থেকে ২০ জন করে প্রকৃত শ্রমিক রয়েছে। তাঁরাই সব সময় কাজ করেন। বাকিদের নাম তালিকায় থাকলেও তাঁরা নেতা বা তাঁদের আত্মীয়। টাকা উত্তোলনের বই (জব কার্ড) ইউনিয়ন পরিষদে জমা রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের এসব কার্ড দেওয়া হয় না। শুধুমাত্র টাকা ওঠানোর সময় দেয়। এবার ২০ দিন হয়ে গেছে তাঁরা কোনো টাকা পাননি। তাঁরা পরিশ্রম করলেও টাকা পাচ্ছেন না। আর নেতারা কাজ না করে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।

দিগপাইত ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।

জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সাংসদ মো. মোজাফফর হোসেন বলেন, শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকার পরও, যাঁরা কাজ করছেন না, তাঁদের টাকা ফেরত নেওয়ার জন্যে পিআইওকে বলা হবে। শ্রমিকের তালিকায় নেতাদের নাম থাকাটা দুঃখজনক। তালিকাগুলো আগে থেকেই করা ছিল। এই তালিকা যাচাই-বাছাই করা হবে।

পিআইও মো. আরিফুর রহমান বলেন, ওই ইউনিয়নে শ্রমিকের উপস্থিতি অনেক কম থাকার বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। যেখানে শ্রমিকের উপস্থিতি কম পাওয়া যাবে, সেখানে শ্রমিকের টাকা ফেরত নেওয়া হবে। তারপরও যদি শ্রমিকেরা অনুপস্থিত থাকেন, খোঁজখবর নিয়ে মজুরি দেওয়া হবে না। আর তালিকায় নেতাদের নামের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0