রাজধানীর মিরপুর এলাকায় আবারও এক অজ্ঞাতপরিচয় তরুণের (২৫) গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে এ এলাকায় গত ১১ দিনে একই কায়দায় তিন তরুণের লাশ পাওয়া গেল।
পুলিশ জানায়, গতকাল সোমবার ভোরে মিরপুরের কালশীর লোহার ব্রিজের পাশে একটি গ্যারেজের সামনের রাস্তা থেকে গুলিবিদ্ধ অজ্ঞাতনামা তরুণের লাশটি উদ্ধার করা হয়। লাশের পাশে একটি ব্যাগে সাতটি পেট্রলবোমা ও সাতটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর পরনে ছিল সবুজ রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি, তার ওপর চেক শার্ট, ঘিয়া রঙের প্যান্ট, ছাই রঙের জ্যাকেট ও পায়ে ছিল কালো জুতা।
ক্যান্টনমেন্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বেনজীর আহমেদ লাশটি উদ্ধারে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে নিয়ে আসেন। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লাশটির পরিচয় মেলেনি। নিহত যুবকের ডান কানের ওপরে একটি গুলি ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যেখানে লাশটি পাওয়া যায়, তার পাশে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। সেখানকার লোকজন নিহত তরুণকে চিনতে পারেনি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোববার রাতে কিংবা গতকাল ভোরে এখানে কোনো গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি। অথচ ভোরেই লাশটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। হয়তো অন্য কোথাও মেরে লাশটি এখানে ফেলে রাখা হয়েছে।
পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) কুদরত-ই-খুদা প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনা সম্পর্কে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। লাশের পাশে পেট্রলবোমা ও ককটেল পাওয়ায় নাশকতার কোনো বিষয় আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ তরুণ সম্ভবত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি রাতে মিরপুর বেড়িবাঁধ থেকে বুকে-পিঠে ১০টি গুলি বিদ্ধ অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণের লাশ মিলেছিল। তখনো পুলিশ দাবি করেছিল, তারা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশটি উদ্ধার করেছে। কে বা কারা হত্যা করেছে, তা তারা জানে না।
অবশ্য পরে লাশটি শনাক্ত হয়। সেটি ছিল ছাত্রদলের নেতা আরিফুল ইসলামের (২৩) লাশ। তাঁর স্বজনেরা অভিযোগ করেন, ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি ভোলা যাওয়ার সময় ঢাকার সদরঘাটে কর্ণফুলী-৪ লঞ্চ থেকে আরিফুলকে ডিবি পরিচয়ধারী একদল ব্যক্তি আটক করে নিয়ে যায়। অবশ্য ডিবি এ ধরনের কাউকে আটকের কথা অস্বীকার করেছে।
এর আগে গত ৪ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাষানটেকের একটি বালুর মাঠ থেকে গুলিবিদ্ধ এক তরুণের লাশ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রেও পুলিশের দাবি ছিল একই। লাশটি পাঁচ দিন মর্গে পড়ে থাকার পর গত রোববার তাঁর পরিচয় মেলে। তাঁর নাম জি এম মো. নাহিদ (২২), বাড়ি মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ভাগনে।
নিহত নাহিদের বাবা জি এম সাঈদ অভিযোগ করেন, গত ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর থেকে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সাদা পোশাকে থাকা পুলিশের একটি দল (সিভিল টিম) নাহিদকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ নাহিদকে ছেড়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। এ বিষয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগও দেন তাঁরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ছেলের লাশ পান।
নাহিদের পরিবারের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলে গতকাল জানিয়েছেন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার নিশারুল আরিফ।
১১ দিনের ব্যবধানে রাজধানীর একই এলাকায় প্রায় একই বয়সী তিন তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো বাহিনী জড়িত বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী মো. নূর খান। তিনি বলেন, ‘এখন ক্রসফায়ার করলে প্রশ্ন ওঠে। এগুলো এড়াতে এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটছে কি না, জনমনে এমন সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এটা নতুন একটা কৌশল হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে নূর খান ছাত্রদল নেতা আরিফুলকে ধরে নিয়ে হত্যার উদাহরণ টেনে বলেন, পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের যে বিবরণ তা সত্য হলে, সদরঘাটে লঞ্চ থেকে এভাবে প্রকাশ্যে কাউকে তুলে নিয়ে রাজধানীর আরেক প্রান্তে লাশ ফেলা অন্য কারও পক্ষে খুবই কঠিন কাজ। কারণ এখন রাজধানীজুড়ে অসংখ্য নিরাপত্তা তল্লাশিচৌকি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন