এবার এবি ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের বেনামে বের করে নেওয়া ৮৮ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমোদনও দিয়েছে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই সরেজমিন পরিদর্শনে এ বেনামি ঋণগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। পরে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবি ব্যাংককে চিঠি পাঠিয়ে নির্দেশ দিয়েছিল ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকই আবার পুনঃ তফসিলের অনুমোদন দিয়েছে।
পুনঃ তফসিল অনুসারে বেক্সিমকো গ্রুপ ছয় কোটি টাকার বেশি অর্থ এককালীন বা ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়েছে বলে জানান এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম এ চৌধুরী। ঋণগুলো তিন বছরের জন্য পুনঃ তফসিল হয়েছে।
এদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের নানা অনিয়মের ঋণসহ মোট ৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকার ঋণ ২০২৬ সাল পর্যন্ত পুনঃ তফসিল করেও দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ রূপালী ব্যাংক তাদের ৬০৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে রূপালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণগুলো পুনঃ তফসিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঋণের সুদহার ঠিক করা হয়েছে ১১ শতাংশ। যদিও এখন বাজারে গড় সুদহার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ।
এর আগে সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনঃ তফসিলের সিদ্ধান্ত নেয়। অগ্রণী, ন্যাশনাল, এক্সিম, এবি ব্যাংকেও চলছে এই প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী তিনবারের বেশি কোনো খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা যায় না। অথচ সোনালী ব্যাংকের পর্ষদ এরই মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ সপ্তমবারের মতো পুনঃ তফসিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের আবেদন গ্রহণ করে ঋণ পুনঃ তফসিল করা হচ্ছে। সালমান এফ রহমান আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা। আর্থিক খাতে নানা অনিয়মের দায়ে বেক্সিমকো গ্রুপ তিন দশকের বেশি সময় ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। এর আগেও বারবার পুনঃ তফসিল করে ঋণ পরিশোধ করেনি গ্রুপটি। আবার ১৯৯৬ ও ২০০৯-১০ সালে শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় বেক্সিমকো গ্রুপের নাম রয়েছে।
বেক্সিমকোর দেখানো এ পথ ধরেই এখন দেশের বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের বড় খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এখন পর্ষদের সামনে নীতিমালা তৈরি করে উত্থাপন করা হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক থাকাকালে খেলাপি ঋণের ওপর অনেকগুলো গবেষণা চালান। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ৩০-৩৫ বছর ধরে এমন কয়েকজন খেলাপি দেশের ব্যাংক খাতে লুটপাট চালিয়ে আসছে।
মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে আরও বলেন, আমেরিকার অর্থনীতিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রভাবশালী কিছু শিল্পপতিকে লুটপাটকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হতো ‘রবার ব্যারন’। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন এই রবার ব্যারনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এবি ব্যাংকের ঋণ: ২০১৩ সালে মধ্যভাগে এবি ব্যাংক থেকে এই ঋণগুলো নিতে বেক্সিমকো গ্রুপ আলোচিত হুন্ডি কারবারি গিরিধারী লাল মোদির প্রতিষ্ঠান উত্তরা ট্রেডার্সকে ব্যবহার করে। এবি ব্যাংক যাচাই না করেই ঋণগুলো দ্রুত অনুমোদন দিয়ে বিতরণ করেছিল। এ নিয়ে গত ১৩ নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রধান সংবাদ হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বেনামে ঋণ নেওয়ার বিস্তারিত প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ১ জুলাই উত্তরা ট্রেডার্স এবি ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোড শাখায় ৭০ কোটি টাকার ঋণ (সিসি বা ক্যাশ ক্রেডিট) চেয়ে আবেদন করে। এর পরের দিনই উত্তরা ট্রেডার্স একই শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলে। এর ১০ দিনের মাথায়, ১১ জুলাই শাখা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠালে ২৫ জুলাই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ৫৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে। ২৯ জুলাই ঋণ মঞ্জুরের তথ্য শাখাকে জানানো হলে শাখা ৩১ জুলাই ও ৫ আগস্ট ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা করে উত্তরা ট্রেডার্সের চলতি হিসাবে পাঠিয়ে দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রথম দফায় ৩১ জুলাই উত্তরা ট্রেডার্সের হিসাবে ঋণের ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা হওয়ার পর ওই দিনই দুটি চেক (১৭ ও ১০ কোটি) তৈরি করা হয় বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের নামে। ১৭ কোটি টাকার চেকটি এবি ব্যাংক প্রিন্সিপাল শাখার মাধ্যমে কারওয়ান বাজার শাখায় নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাবে জমা হয়। আর ১০ কোটি টাকার চেকটি আইএফআইসি ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাবে জমা করা হয়। এভাবে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি পুরো অর্থ নিয়ে নেয়। উত্তরা ট্রেডার্সের হিসাবে ঋণের অবশিষ্ট মাত্র ৫০ লাখ টাকা থেকে যায়। এই ৫০ লাখ টাকা এবং ৫ আগস্ট ঋণের আরও যে ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তরা ট্রেডার্সের হিসাবে জমা হয়, তা একত্রে (অর্থাৎ ২৮ কোটি টাকা) ৫ ও ৬ আগস্ট তৈরি পাঁচটি চেকে এবি ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার মাধ্যমে একইভাবে কারওয়ান বাজার শাখায় নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাবে স্থানান্তরিত হয়। পুরো অর্থই প্রিন্সিপাল শাখায় নগদে উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে দেড় কোটি টাকার একটি চেক নগদে উত্তোলন দেখিয়ে তা ইনডিপেনডেন্ট পাবলিকেশনসের (বেক্সিমকো গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান) হিসাবে জমা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর স্থানীয় ব্যবসা বাড়াতে উত্তরা ট্রেডার্সের নামে ২৫ আগস্ট আরও ২৫ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করা হয়। ২৭ আগস্ট এবি ব্যাংকের পর্ষদ তা অনুমোদন করে। ২৯ আগস্ট প্রধান কার্যালয় ঋণ মঞ্জুরের তথ্য শাখাকে পাঠায়। ২ সেপ্টেম্বর উত্তরার হিসাবে তা জমা হলে পর্যায়ক্রমে ২, ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর তিনটি চেকের মাধ্যমে ২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা কারওয়ান বাজার শাখায় নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাবে জমা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের অর্থ জমা ও স্থানান্তর ছাড়া উত্তরা ট্রেডার্সের চলতি হিসাবটিতে আর তেমন কোনো লেনদেন হয়নি। আর উত্তরা ট্রেডার্স যেদিন (২ জুলাই ২০১৩) এবি ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোড শাখায় চলতি হিসাব খোলে, একই দিন নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের নামে কারওয়ান বাজার শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। ঋণের সব অর্থ উত্তোলনের পর ২০১৩ সালে ৩ অক্টোবর নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের এ হিসাবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। উত্তরা ট্রেডার্সের হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর ছাড়া নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের এ হিসাবে আর তেমন কোনো লেনদেনই হয়নি। এ ঋণের বিপরীতে সহায়ক জামানত হিসেবে যে সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে, তার আমমোক্তারনামা উত্তরা ট্রেডার্সের অন্যতম মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিরিধারী লাল মোদি হলেও সম্পত্তির মূল মালিকানা বেক্সিমকো গ্রুপের। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘ফলে এটা সুস্পষ্ট যে, উক্ত ঋণটি একটি বেনামি ঋণ, যার প্রকৃত বেনিফিশিয়ারি নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান)।’

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন