বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম দিকে এ হত্যাকাণ্ডের খবর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে তেমন গুরুত্ব পায়নি। এক সপ্তাহের মাথায় গত বৃহস্পতিবার সাবিনার হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন অনলাইনে প্রধান প্রতিবেদন করা হয়। এর মধ্যে বিবিসি, গার্ডিয়ান, রয়টার্সসহ অন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও গুরুত্ব দিয়ে এ খবর প্রকাশ করে।

গতকাল সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লন্ডনের কেন্দ্রস্থল থেকে ২০ মিনিটের মতো ট্রেনের দূরত্বের কিডব্রুক এলাকার বাসিন্দারা তাঁদের কমিউনিটিতে এ হত্যাকাণ্ডে গভীরভাবে বেদনাহত হয়েছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় সাবিনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কিডব্রুকে মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়। সেখান থেকে লন্ডনের রাস্তায় নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়। ওই কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে সাবিনার বোন জেবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘সাবিনা পরিবারকে ভালোবাসত। আমরা আমাদের বোনকে হারিয়েছি। আমার মা-বাবা তাঁদের মেয়েকে হারিয়েছেন। আর আমার মেয়েরা হারিয়েছে দারুণ একজন মেধাবী ও মমতাময়ী খালাকে।’ তিনি বলেন, ‘কেবলই মনে হচ্ছে, আমরা একটি দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে আছি এবং সেখান থেকে বের হতে পারছি না।’

প্রায় দুই বছর ধরে লন্ডনের এ এলাকায় বসবাসরত আলিয়া ইসায়েভা বলেন, ‘আপনাকে এটা বুঝতে হবে যে এ ঘটনা আপনার সঙ্গেও ঘটতে পারত। এটা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে।’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা মানুয়েলা কলমবিনি বলেছেন, ‘আমরা নিরাপদ বোধ করতে চাই। আমাদের দুটি অল্প বয়সী মেয়ে আছে। আমি চাই না তারা এমনভাবে বেড়ে উঠুক ও চিন্তা করুক যে তারা বাইরে রাস্তায় বা পার্কে যেতে পারবে না।’

default-image

সাবিনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটন। টুইটারে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, লন্ডনের রাস্তায় আরেক নিষ্পাপ তরুণীর প্রাণহানিতে তিনি ব্যথিত। নিজের অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে দেওয়া ওই পোস্টে ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই বধূ লিখেছেন, ‘সাবিনার পরিবার ও বন্ধু এবং এ মর্মান্তিক ঘটনায় যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সবার প্রতি আমি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও সাবিনার পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। সাবিনার স্মরণে ডাউনিং স্ট্রিটের সিঁড়িতে প্রজ্বলিত মোমবাতির একটি ছবি টুইটারে পোস্ট করেছেন তিনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এ ধরনের জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধ এবং আমাদের রাস্তাগুলো আরও নিরাপদ করতে আমরা সবকিছু করব।’

সাবিনা নেসার বাবার নাম আবদুর রউফ। ১৯৮০ সালের দিকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। তাঁদের বসবাস যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের স্যান্ডি এলাকায়। সেখানেই বেড়ে উঠেছেন সাবিনা। চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ারে শিক্ষা নিয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট করেন সাবিনা। পরে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের লিউশাম বরোর ক্যাটফোর্ডের রুশি গ্রিন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা লিসা উইলিয়ামস বলেছেন, সাবিনা তাঁর শিক্ষার্থীদের প্রতি দয়ালু, যত্নশীল ও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।

সাবিনা নেসার হত্যাকাণ্ডকে মর্মান্তিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। তিনি বলেছেন, নারীর প্রতি ‘সহিংসতার মহামারি’ সন্ত্রাসবাদ দমনের সমান গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

লন্ডনে একের পর এক নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত মার্চে দক্ষিণ লন্ডনে সারাহ এভারার্ড নামের এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। গত বছর লন্ডনের একটি পার্কে বিবা হেনরি ও নিকোল স্মলম্যান নামে দুই নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডে এক কিশোর দণ্ডিত হয়।

তৃতীয় ব্যক্তি গ্রেপ্তার

সাবিনা হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ। লন্ডন থেকে শতাধিক মাইল দূরের ইস্ট সাসেক্সের একটি বাসা থেকে ভোররাত তিনটার দিকে ৩৮ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। সম্প্রতি এ হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট একটি সিসি ক্যামেরা ফুটেজ প্রকাশ করে এক সন্দেহভাজন সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিল লন্ডন পুলিশ। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সাবিনা হত্যাকাণ্ডের অল্প কিছুক্ষণ আগে টাকমাথার এক ব্যক্তি পেগলের স্কয়ার দিয়ে হেঁটে যান। হুড টেনে মাথা ঢাকতে দেখা যায় তাঁকে। গতকাল গ্রেপ্তার ব্যক্তি তিনিই কি না, তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডে এর আগে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করলেও তদন্তের আওতায় রেখে তাঁদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।

সুনামগঞ্জে শোক

লন্ডনে সাবিনা নিহত হওয়ার খবরে শোকার্ত সুনামগঞ্জের দাওরাই গ্রামে বসবাসরত তাঁর স্বজনেরা। এখানে সেলিম আহমদ নামের তাঁর এক চাচা এবং লুৎফা বেগম নামের একজন ফুফু থাকেন। সেলিম আহমদ গতকাল প্রথম আলোকে জানান, লন্ডন থেকে ফোনে সাবিনার খুন হওয়ার ঘটনাটি তাঁদের জানানো হয়। এরপর থেকে সবাই কান্নাকাটি করছেন। সেলিম আহমদ বলেন, ‘আমার এই ভাতিজি অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। সব সময় আমাদের খোঁজখবর নিত।’

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন