default-image

কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ মো. মুজিবুল হক নদী দখলদারদের উচ্ছেদ চাননি। সাবেক এই রেলপথমন্ত্রী তাঁর ইচ্ছার কথা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড়কর্তাকে জানিয়েছিলেন। তিনি সে কথা জেলা প্রশাসককে জানান। জেলা প্রশাসন আর উচ্ছেদে নামেনি।

কথা ছিল, ২৫ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাঁকড়ী নদীর উদ্ধার অভিযান হবে। জেলা প্রশাসন আঁটঘাট বেঁধে তৈরি ছিল। ভেস্তে গেল। প্রশাসনের একটি অংশ বলছে, রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব না।

প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, ছোট এই নদীর দুই পাড়ে ১২৫ জন অবৈধ দখলদার আছে। এলাকার সাংসদ মুজিবুল হক তাঁদের ৬৮ জনকে উচ্ছেদ করতে নিষেধ করেন।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আবুল ফজল মীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংসদ মহোদয় উচ্ছেদ অভিযান করতে না করে দিয়েছেন। এ–সম্পর্কিত একটি চিঠি পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাকে দিয়েছে। আমি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আর নদী কমিশনকে জানিয়েছি। এর বাইরে আমার কী করার আছে?’

আর সাংসদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ফোন করেছি কেবল কাঁকড়ী নদীর পাড়ের বাইরের স্থাপনা আপাতত উচ্ছেদ না করার জন্য, পুরো চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জন্য নয়।’

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটে নদী দখলদারদের সর্বশেষ তালিকা বলছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে সবচেয়ে লম্বা তালিকা কুমিল্লা জেলার। সারা দেশে নদ–নদী-খাল দখলদারের সংখ্যা সাড়ে ৩৯ হাজারের মতো। কুমিল্লা জেলায় আছে পৌনে তিন হাজারের মতো।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাবে অবশ্য কুমিল্লার ১৭ উপজেলার শুধু ১৩টিতেই তিন হাজারের মতো অবৈধ স্থাপনা আছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের তালিকা করা শেষ হয়নি। তিনি আরও বলেন, যেসব জায়গায় উচ্ছেদ করা যায়নি, সেগুলোতে আবার অভিযান হবে।

গোমতী, ডাকাতিয়া, কাঁকড়ী, তিতাস ও মেঘনা হচ্ছে জেলার প্রধান পাঁচ নদী। শেষ দুটি নদীর কুমিল্লা অংশের দখলদারদের তালিকা এখনো হয়নি। ডাকাতিয়ার তালিকা আংশিক। এ ছাড়া জেলায় বড় খাল আছে ৫০টি। সেগুলোতেও দখল আছে।

>

কাঁকড়ী নদীর দখলদার উচ্ছেদে বাধা দিয়েছেন সাংসদ
শহরের গোমতী মৃতপ্রায়

নদী কমিশন দেশজুড়ে দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করেছে গত জানুয়ারিতে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে করানো তালিকাগুলো তৈরি করেছে ইউনিয়ন ভূমি অফিস। ইতিমধ্যে কুমিল্লা জেলায় কাঁকড়ী ও গোমতী নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। দুটি উদ্যোগই আপাতত ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কুমিল্লা আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘নদী উদ্ধারে রাজনৈতিক দলগুলোর সায় নেই। প্রশাসন একা দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারবে না।’

কাঁকড়ীর উদ্ধার পণ্ড যেভাবে

কাঁকড়ী নদী উপজেলাটির কাশিনগর ইউনিয়নের অলিপুর বাজারের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। সেখানে নদীর মধ্যে দোকানঘর তোলা হয়েছে। ইটের গাঁথুনির ওপর টিনের ঘর। এগুলো অক্ষত রেখে নদী খনন করা হয়েছে।

যে ৬৮ জনের জন্য সাংসদ সুপারিশ করেছেন, তাঁরা অলিপুর আর যাত্রাপুরে কাঁকড়ী নদীর জায়গা দখল করে দোকান দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, দোকান সরানোর জন্য পাউবো তাঁদের কয়েক দফা নোটিশ দেয়। তারপর উচ্ছেদ চালানোর জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে ১২ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে।

ডিসি ১৯ ফেব্রুয়ারি পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে এ দায়িত্ব দেন। উচ্ছেদের তারিখ ঠিক হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি। ২০ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের সাংসদ মো. মুজিবুল হক পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ফোন করে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত করতে বলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী ওই দিনই ডিসিকে তা লিখে জানালে কাঁকড়ী উদ্ধারের ইতি হয়।

১২ মার্চ দুপুরে অলিপুর বাজারের অন্তত তিনজন ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, নদীর জমিতে দোকানপাটগুলোর বেশির ভাগই এরশাদ সরকারের সময় করা। এরপর যখন যে দলের সরকার এসেছে, সেটির নেতা-জনপ্রতিনিধিদের সন্তুষ্ট করে দখলদারেরা টিকে আছেন।

পুরাতন গোমতী এখন ভাগাড়

কুমিল্লা শহরের ‘চাঁদপুর পুরাতন ফেরিঘাট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’ স্থাপিত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। তথ্যটা মসজিদের দেয়ালে পাকা অক্ষরে লেখা।

এলাকার লোকজন বলেন, মসজিদটি করা হয়েছিল পুরাতন গোমতী নদী ভরাট করে। মসজিদের পশ্চিম পাশে নদীর মধ্যে ঈদগাহ করার অনুমোদন দেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকারের (২০০১-০৬) নৌপরিবহনমন্ত্রী প্রয়াত কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন। ঈদগাহটি নদী ভরাট করেই করা হয়।

মসজিদের পাশে একটি দোকানে কথা হয় দোকানমালিক শাহজাদা ও তাঁর আত্মীয় সৌদিপ্রবাসী আবুল হোসেনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, একসময় নদী পারাপারের জন্য ফেরি চলত। তাই এলাকার নাম ফেরিঘাট। তাঁদের ধারণা, সেটা ৫০ থেকে ৬০ বছর আগের কথা।

পাউবোর কাগজপত্র বলছে, গোমতীর উৎপত্তি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের দুমবোর হ্রদে। নদীটি কুমিল্লা শহরের আট মাইল দূরে কটক বাজারের কাছে বাংলাদেশে ঢুকেছে। আর দাউদকান্দিতে মেঘনা নদীতে পড়েছে। নদীটির গতিপথ আঁকাবাঁকা ও দীর্ঘ।

১৯৭৭ সালে প্রকাশিত সরকারের জেলা গেজেটিয়ার লিখেছে, ‘বর্ষায় নদী কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। প্রবল পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে নদীতে পানি জমে।’ নদীটিকে কুমিল্লার দুঃখও বলা হতো।

কুমিল্লা শহরকে বন্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ বদলে দেওয়া হয়েছে। শহরের অংশটুকুকে লোকে পুরাতন গোমতী নামে ডাকে। কাপ্তানবাজার থেকে চানপুর পর্যন্ত এর বিস্তার। দৈর্ঘ্য ছয় কিলোমিটার। এটি এখন আর নদী নেই। এতে কোনো স্রোত বা নৌচলাচল নেই।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নদীর ওপর পাঁচটি আড়াআড়ি বাঁধ দিয়েছে মানুষের চলাচলের জন্য। এসব বাঁধ চকবাজার, গর্জনখোলা, থানারোড, চৌধুরীপাড়া ও কাপ্তানবাজার এলাকায়। বাঁধবন্দী নদীটি সাতটি বড় ডোবার চেহারা নিয়েছে। গভীরতা কোথাও কোথাও ১০০ ফুটের নিচে নেমেছে।

দুই তীরের বাসিন্দারা বছরের পর বছর ধরে নদী দখল করে বাড়িঘর তৈরি করেছে। বাঁধগুলোতে গেলে বোঝা যায়, তাঁদের গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার মূল জায়গা এই নদী। তাঁরা বালু-সুরকি-মাটিও ফেলেন। নদী ভরাট করে জমি বাড়ান। কোতোয়ালি এলাকায় নদীর মধ্যেই সিটি করপোরেশন বিশাল পাকা আস্তাকুঁড় তৈরি করেছে। নদীর জমিতে বাড়িঘর তৈরির প্রতিযোগিতায় ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই।

এলাকার মানুষজন বলেন, দখলদারদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা আছেন। হয়তো বাবা-দাদারা দখল করেছিলেন, পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে টিকে গেছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পাউবো তালিকা করে, নোটিশ দেয়।

জেলা প্রশাসন বলছে, দুই পাড়ে ৫২২ জন নদী দখল করে কাঁচা-পাকা স্থাপনা তৈরি করেছে। প্রথম তালিকা করা হয়েছিল ২০০৩ সালে। তখন থেকে দখলদারদের নদীর জায়গা ছেড়ে দিতে ১০ বার নোটিশ দিয়েছে প্রশাসন। ওই পর্যন্তই।

নদীর কালো, দুর্গন্ধময় পানিতে কেউ নামে না। শুধু একটি এলাকায় একটি ডিঙি নৌকায় বসে দুজন কচুরিপানা সরাচ্ছিলেন। বললেন, তাঁরা নদীর মালিকের লোক। সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে মালিক এখানে মাছ চাষ করেন।

গোমতীর মূলধারার দুর্গতি

বাংলাদেশে ঢোকার পর দাউদকান্দির সাপটা এলাকায় মেঘনায় পড়া পর্যন্ত মূল গোমতী নদী ৯৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। এ গতিপথের সবটাই কুমিল্লা জেলায়।

বাংলাদেশ অংশের উজানে ৭০ কিলোমিটার ধরে নদীর দুই পাড়েই বাঁধ। ফলে ডাঙা থেকে পানি নদীতে নামতে পারে না, বন্যা হয়। আবার শুকনা মৌসুমে ভারত নিজের অংশের পানি ছাড়ে না। বাংলাদেশ অংশে তখন পানির ধারা ক্ষীণ হয়ে আসে।

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গেলে গোমতীর শুকনা স্রোতহীন চেহারাটা দেখা যায়। নদীটা ভারতের ত্রিপুরায় আঁকাবাঁকা ১৫০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আসে। বর্ষাকালে এটা অনেক বালু বয়ে আনে। নদী বাংলাদেশে ঢোকার অল্প পরেই দেখা যায়, বালু আর মাটি তোলা চলছে লাগামহীন।

সোনাইছড়ি ভাসমান পাম্প সেচ প্রকল্প থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে নদীর দক্ষিণ পাড়ে তিনটি ট্রাক। নদী থেকে ভেজা বালু যন্ত্র দিয়ে ওই ট্রাকে তোলা হচ্ছে। ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের পথ আটকান ব্যবসায়ীদের লোকজন।

জেলা প্রশাসনের সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, বৈধ বালুমহাল আছে ছয়টি। কিন্তু বালু ও মাটি তোলা হচ্ছে কমপক্ষে ৫০টি জায়গা থেকে। লাগামছাড়া আহরণের কারণে কখনো নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিতে পড়ছে। আবার ট্রাক ওঠা–নামার জন্যও অনেক জায়গায় বাঁধ কেটেছেন ব্যবসায়ীরা।

পাশাপাশি চলছে তীর দখল। শহরের কাপ্তানবাজারে পাক্কারমাথা এলাকায় মূল গোমতী নদীর চৌহদ্দির মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান একটি স্কুল করেছেন। তাঁর দলের নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পানিসম্পদমন্ত্রী থাকার সময় তিনি পাউবোর কাছ থেকে জায়গাটি লিজ নিয়ে টিনচালার আধাপাকা ভবন করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এলাকার পশ্চাৎপদ বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য স্কুলটি করেছেন।

ডিসি মো. আবুল ফজল বলছেন, সাংসদ মহোদয়েরা জনপ্রতিনিধি। তাঁরা না চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখা ছাড়া তাঁর কিছুই করার থাকে না।

সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না

নদী কমিশনের নির্দেশে দেশের অন্যান্য জেলার মতো কুমিল্লা জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের তালিকা করে ২০১৯ সালে। তার আগের বছর মার্চে কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদার কুমিল্লায় গিয়ে গোমতীর পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন।

তাঁর উপস্থিতিতে ৫ মার্চ জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভা হয়। সভায় ১৪টি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল নদীর সীমানা চিহ্নিত করা, খনন, নদীর জমির লিজ বাতিল করা, বালুমহাল ইজারা না দেওয়া, বাঁধের ভেতরে মাটি কাটা বন্ধ করা, দরিদ্র দখলদারদের জন্য আবাসন তৈরি করা আর নদীদূষণ ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া।

খোদ প্রশাসনের কর্মকর্তারাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনোটিই এগোয়নি। পরিবেশ আন্দোলনকর্মীসহ এলাকার মানুষজনও একই অভিযোগ করলেন। আর কাঁকড়ী উদ্ধার থেমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁদের বলছে, নদী উদ্ধার সহজ কাজ না।

গত ২২ ডিসেম্বর আদর্শ উপজেলার গোমতী নদীর পাড়ে ১৩৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল জেলা প্রশাসন। অন্তত ১১ জনের রিট আবেদনের মামলা আদালতে চলছিল। তাঁদের স্থাপনায় হাত দেওয়া হয়নি। এদিকে ২২ ফেব্রুয়ারি দেখা যায়, অনেকে নতুন করে ঘরবাড়ি তুলেছেন।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, জেলা পরিষদের উচিত দায়িত্ব পালনে দৃঢ় থাকা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রীদেরও জেলা প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে। তবে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা মনে করছেন, সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সহযোগিতা সমর্থন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0